
সম্পাদকীয়: একটি দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও সামাজিক নিরাপত্তার অন্যতম শক্তিশালী স্তম্ভ হলো সুদৃঢ় বিমা খাত। অথচ দুঃখজনক হলেও সত্য, উদীয়মান অর্থনীতির দেশ হয়েও বাংলাদেশে বিমা খাতটি দীর্ঘদিন ধরে অবহেলিত এবং আস্থার সংকটে জর্জরিত।
সময়ের বিবর্তনে এবং দেশের অর্থনীতির কলেবর বৃদ্ধি পেলেও সেই অনুপাতে বাড়েনি বিমার বিস্তার। বর্তমান প্রেক্ষাপটে বিমা খাতের সার্বিক ব্যবস্থাপনা এবং প্রতিটি নাগরিকের জীবন সুরক্ষায় বিমার অপরিহার্যতা নিয়ে নতুন করে ভাবার সময় এসেছে।
বিমা খাতের বর্তমান ব্যবস্থাপনা ও বাস্তবতা:
বর্তমানে দেশে সরকারি ও বেসরকারি মিলিয়ে প্রায় ৮২টির মতো বিমা কোম্পানি কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এর মধ্যে জীবন বিমা এবং নন-লাইফ বা সাধারণ বিমা উভয় খাতই রয়েছে। আইডিআরএ (IDRA)-এর তদারকিতে খাতটি পরিচালিত হলেও এর ব্যবস্থাপনা নিয়ে রয়েছে নানা প্রশ্ন। বর্তমানে বাংলাদেশের জিডিপিতে বিমার অবদান বা পেনিট্রেশন রেট অত্যন্ত নগণ্য (এক শতাংশেরও কম)।
বিমা খাতের প্রধান বর্তমান সংকটগুলো হলো:
গ্রাহক আস্থার অভাব: পলিসির মেয়াদ শেষ হওয়ার পর বা বিপদের দিনে সহজে বিমা দাবি (Claim) না পাওয়া এবং দীর্ঘসূত্রিতা গ্রাহকদের মনে গভীর আস্থার সংকট তৈরি করেছে।
অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনা: অতীতে কিছু কিছু কোম্পানির আর্থিক অনিয়ম এবং অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা ব্যয়ের কারণে পুরো খাতটি নেতিবাচক ধারণার শিকার হয়েছে।
সচেতনতার ঘাটতি: সাধারণ মানুষের মধ্যে বিমাকে একটি বাধ্যতামূলক আর্থিক নিরাপত্তা হিসেবে না দেখে অপ্রয়োজনীয় বা অতিরিক্ত খরচ হিসেবে বিবেচনা করার প্রবণতা রয়েছে।
তবে আশার কথা হলো, খাতটিতে শৃঙ্খলা ফেরাতে এবং গ্রাহকের পাওনা পরিশোধে সম্প্রতি সরকার ও নিয়ন্ত্রন সংস্থা কঠোর অবস্থান নিয়েছে। বিমা খাতের সংস্কার ও আস্থার পরিবেশ তৈরিতে বিভিন্ন আইনগত সংশোধনী এবং আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থাপনার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।
প্রতিটি নাগরিকের জন্য বিমার প্রয়োজনীয়তা:
উন্নত বিশ্বে যেকোনো মানুষের জীবন, স্বাস্থ্য এবং সম্পত্তির সুরক্ষায় বিমা হলো প্রথম এবং প্রধান প্রতিরক্ষা কবচ। কিন্তু আমাদের দেশে বিমা কেবল কিছু কর ছাড় পাওয়ার মাধ্যম কিংবা নির্দিষ্ট কিছু মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ।
অথচ প্রতিটি নাগরিকের জন্য বিমা কেন প্রয়োজন, তার যৌক্তিকতা অপরিসীম।
১. জীবন ও পরিবারের আর্থিক সুরক্ষা: পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিটির আকস্মিক মৃত্যু বা স্থায়ী অক্ষমতা পুরো পরিবারকে পথে বসিয়ে দিতে পারে। জীবন বিমা থাকলে এমন দুঃসময়ে পরিবারটি অন্তত আর্থিক সংকটে ভেঙে পড়ে না।
২. স্বাস্থ্যঝুঁকি মোকাবিলা: চিকিৎসা ব্যয় মেটাতে গিয়ে বর্তমানে বহু পরিবার নিঃস্ব হয়ে যায়। স্বাস্থ্য বিমা (Health Insurance) চালু থাকলে হাসপাতালের ব্যয়ভার নিয়ে দুশ্চিন্তা করতে হয় না, যা মানসম্মত চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করে।
৩. দুর্ঘটনা ও দুর্যোগকালীন সহায়তা: দুর্ঘটনা, অগ্নিকাণ্ড বা প্রাকৃতিক দুর্যোগে মানুষের সম্পদহানি ঘটে। নন-লাইফ বা সম্পত্তি ও শস্য বিমা থাকলে এসব অপূরণীয় ক্ষতি কাটিয়ে ওঠা সহজ হয়।
৪. দীর্ঘমেয়াদী সঞ্চয় ও বিনিয়োগ: বিমা কেবল সুরক্ষাই দেয় না, এটি একটি শৃঙ্খলাবদ্ধ দীর্ঘমেয়াদি সঞ্চয়ের মাধ্যম। সন্তানদের উচ্চশিক্ষা কিংবা বার্ধক্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিমার বিকল্প নেই।
একটি জনকল্যাণমুখী রাষ্ট্রে প্রতিটি নাগরিকের জীবন ও সম্পত্তির ন্যূনতম নিরাপত্তা রাষ্ট্র ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া উচিত। বাংলাদেশের অর্থনীতি আজ উন্নতির মহাসড়কে, কিন্তু সাধারণ মানুষের আর্থিক নিরাপত্তা এখনো পুরোপুরি সুরক্ষিত নয়। বিমা খাতের ওপর মানুষের হারিয়ে যাওয়া আস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে কঠোর মনিটরিং, স্বচ্ছতা এবং দ্রুত দাবি নিষ্পত্তির মাধ্যমে। একই সাথে, প্রতিটি নাগরিকের দোরগোড়ায় সহজ শর্তে ও সাশ্রয়ী মূল্যের বিমা সেবা পৌঁছে দিতে হবে। কারণ, একটি নিরাপদ ও সুরক্ষিত জাতি গঠনে বিমা কোনো বিলাসিতা নয়, এটি প্রতিটি নাগরিকের মৌলিক অধিকার ও আত্মরক্ষার অনিবার্য হাতিয়ার।
সুফি মোহাম্মদ আহসান হাবীব
ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সম্পাদক
দুরন্ত সত্যের সন্ধানে-দুসস
ও ভাষা টিভি
মহাসচিব, জাতীয় ভাষা পরিষদ।
Leave a Reply