
শিশুর অবচেতন মনের দুঃখগুলো
গল্পকার: মাহবুব রহমান
দপ্তর সম্পাদক, জার্নালিস্ট ইন্টারন্যাশনাল সোসাইটি (JIS)
তারিখ: ১৮ অক্টোবর ২০২৬
একটি সময় আমরা সবাই শিশু ছিলাম। শৈশব পেরিয়ে যৌবনে পদার্পণ করেছি, জীবনের নানা পথ অতিক্রম করে আজ অনেক দূরে এগিয়ে গিয়েছি। কিন্তু জীবনের সেই সোনালি শৈশবকে কি কখনো ভুলতে পেরেছি?
আমাদের অনেকেই যৌথ পরিবারে, গ্রামের নির্মল পরিবেশে বড় হয়েছি। পড়াশোনা ও কর্মসংস্থানের প্রয়োজনে ধীরে ধীরে শহরমুখী হয়েছি। ব্যস্ত জীবনের টানে গ্রামের সঙ্গে দূরত্ব বেড়েছে। তবুও মনের গভীরে রয়ে গেছে গ্রামের মেঠোপথ, নির্মল বাতাস, মুরুব্বিদের স্নেহমাখা আচরণ এবং মানুষের আন্তরিক ভালোবাসা।
কিন্তু শহরের শিশুদের শৈশব কি তেমন?
শহরের অনেক শিশু বেড়ে ওঠে যানবাহনের বিকট হর্ন, মানুষের চিৎকার, পারিবারিক কলহ এবং নানা ধরনের মানসিক চাপের মধ্যে। কোথাও বাড়ির মালিকের দুর্ব্যবহার, কোথাও সামাজিক বৈষম্য, আবার কোথাও বড়দের অযৌক্তিক রাগের শিকার হতে হয় কোমলমতি শিশুদের।
শিশুরা যখন ভালোবাসা, নিরাপত্তা ও সুন্দর আচরণ পাওয়ার কথা, তখন তাদের কেউ কেউ শৈশবেই মানসিক নির্যাতনের অভিজ্ঞতা অর্জন করে।
একটি বাস্তব ঘটনা
অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে বলতে হচ্ছে, গতকাল একটি শিশুকে নির্যাতনের খবর জানতে পেরেছি।
তৃতীয় বা চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ুয়া একটি শিশু মহল্লার মাঠে বন্ধুদের সঙ্গে ফুটবল খেলতে গিয়েছিল। খেলার একপর্যায়ে ফুটবলটি গিয়ে লাগে স্থানীয় এক ব্যক্তির গায়ে। আর এতেই ক্ষুব্ধ হয়ে ওই ব্যক্তি শিশুটির ওপর চড়াও হন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
শিশুটির বাবা একটি কোম্পানিতে চাকরি করেন, আর মা একজন শিল্পশ্রমিক। তাঁদের আদরের সন্তানটি বন্ধুদের সঙ্গে খেলতে গিয়েছিল একটু আনন্দের আশায়।
কিন্তু অভিযোগ অনুযায়ী, শিশুটির পরিবার ভাড়াটিয়া এবং স্থানীয় নয়—এই পরিচয়কে কেন্দ্র করে তার সঙ্গে দুর্ব্যবহার করা হয়। তাকে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করা হয়, শারীরিকভাবে আঘাত করা হয় এবং একপর্যায়ে তার জামাকাপড়ও ছিঁড়ে ফেলা হয়।
একবার ভাবুন তো, যে বয়সে একটি শিশু নিজের ভুলের পরিণতি পুরোপুরি বোঝার মতো পরিপক্ব হয়ে ওঠেনি, সেই বয়সে তার সঙ্গে এমন আচরণ কতটা অমানবিক!
ফুটবল কারও গায়ে লাগলে তাকে সতর্ক করা যেত, বোঝানো যেত, প্রয়োজনে তার অভিভাবকের সঙ্গে কথা বলা যেত। কিন্তু একটি শিশুকে অপমান করা কিংবা শারীরিকভাবে আঘাত করা কি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য?
শিশুটি যদি কোনো ধনী পরিবারের সন্তান হতো, কিংবা ওই ব্যক্তির নিজের সন্তান হতো, তাহলে কি একই আচরণ করা হতো? এই প্রশ্নটি আমাদের বিবেকের কাছে রেখে গেলাম।
আমাদের করণীয়
একটি সুন্দর সমাজ গড়তে হলে প্রথমেই আমাদের হৃদয়ের কঠোরতা দূর করতে হবে। শিশুদের প্রতি হতে হবে আরও সহানুভূতিশীল, আরও দায়িত্বশীল।
নিজের সন্তানকে যেভাবে আদর করি, অন্যের সন্তানকেও সেভাবে ভালোবাসতে শিখতে হবে।
বাড়ির মালিক ও ভাড়াটিয়া, ধনী ও দরিদ্র কিংবা স্থানীয় ও বহিরাগত—এমন পরিচয়ের ভিত্তিতে কোনো শিশুর সঙ্গে বৈষম্য করা চলবে না।
মনে রাখতে হবে, প্রতিটি শিশুরই রয়েছে সম্মান, নিরাপত্তা ও ভালোবাসা পাওয়ার অধিকার।
আজ যে শিশুটি অবহেলা ও অপমানের শিকার হচ্ছে, আগামীকাল সে-ই হতে পারে একজন প্রশাসনিক কর্মকর্তা, একজন পুলিশ কর্মকর্তা, একজন সেনা কর্মকর্তা, একজন শিক্ষক কিংবা দেশের গুরুত্বপূর্ণ কোনো দায়িত্বশীল ব্যক্তি।
তবে ভবিষ্যতে সে কী হবে, সেটিই বড় কথা নয়। একটি শিশু মানুষ হিসেবে সম্মান ও নিরাপত্তা পাওয়ার অধিকার রাখে—এটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
শেষ কথা
আমার এই লেখা কোনো বিশেষ ব্যক্তিকে লক্ষ্য করে নয়। সমাজের প্রতিটি মানুষের মধ্যে শিশুদের প্রতি দায়িত্ববোধ, মমত্ববোধ ও ভালোবাসা জাগিয়ে তোলার উদ্দেশ্যেই এই ক্ষুদ্র প্রচেষ্টা।
আসুন, আমরা নিজেদের সন্তানদের পাশাপাশি অন্যের সন্তানদেরও ভালোবাসি। তাদের ভুল হলে শাসনের নামে নির্যাতন না করে বুঝিয়ে বলি। তাদের বেড়ে ওঠার জন্য তৈরি করি নিরাপদ, বৈষম্যহীন ও মানবিক পরিবেশ।
কারণ, আজকের শিশুই আগামী দিনের ভবিষ্যৎ। আজকের শিশুর হাত ধরেই গড়ে উঠবে আগামী দিনের বাংলাদেশ।
শিশুর মুখে হাসি ফুটুক, প্রতিটি শৈশব হোক নিরাপদ ও আনন্দময়।
✍️ মাহবুব রহমান
দপ্তর সম্পাদক
জার্নালিস্ট ইন্টারন্যাশনাল সোসাইটি (JIS)
📺 ভাষাটিভি (BhashaTV)
তথ্য সরবরাহকারী সংবাদ সংস্থা
সত্য প্রতিদিন | ভাষাটিভি
#শিশুর_অবচেতন_মনের_দুঃখ #শিশুর_অধিকার #শিশু_নির্যাতন #বৈষম্যহীন_সমাজ #মানবিক_বাংলাদেশ #ভাষাটিভি #JournalistInternationalSociety
Leave a Reply