
মুহাম্মদ খায়রুল হাসান মামুন
আহবায়ক আইযেএ
পোশাকশিল্পে ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা: শিক্ষিত বেকার যুবকদের কর্মসংস্থানের নতুন সম্ভাবনা
বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি পোশাকশিল্প। দেশের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন, শিল্পায়ন এবং বিপুল জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থানে এই খাতের অবদান অনস্বীকার্য। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে পোশাকশিল্পে কর্মরত শ্রমিকদের মজুরি, জীবনযাত্রার ব্যয় এবং পেশাগত মর্যাদা নিয়ে নানা আলোচনা ও অসন্তোষ রয়েছে।
বর্তমান বাস্তবতায় পোশাকশিল্পের শ্রমিকদের জন্য ন্যূনতম মাসিক মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণের প্রস্তাব শুধু শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়নের বিষয় নয়; এটি বাংলাদেশের শিক্ষিত বেকার যুবকদের জন্যও একটি নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে।
আমাদের সমাজে একটি প্রচলিত মানসিকতা রয়েছে—এসএসসি, এইচএসসি কিংবা স্নাতক ডিগ্রি অর্জনের পর একজন তরুণ সাধারণত অফিস, ব্যাংক, সরকারি চাকরি কিংবা করপোরেট প্রতিষ্ঠানে কাজ করতে আগ্রহী হন। পোশাকশিল্পের উৎপাদন বিভাগ কিংবা অন্যান্য কারিগরি কাজে যোগ দিতে অনেক শিক্ষিত তরুণ সামাজিক মর্যাদা ও আর্থিক নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন।
কিন্তু পোশাকশিল্পে যদি সম্মানজনক বেতন, নিরাপদ কর্মপরিবেশ, দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগ এবং পদোন্নতির নিশ্চয়তা তৈরি করা যায়, তাহলে এই চিত্র বদলে যেতে পারে।
বিশেষ করে ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারিত হলে এসএসসি, এইচএসসি ও স্নাতক পাস অসংখ্য বেকার তরুণ-তরুণী পোশাকশিল্পের বিভিন্ন বিভাগে কাজ করতে আগ্রহী হতে পারেন। একই সঙ্গে ডিপ্লোমা, ইঞ্জিনিয়ারিং ও বিভিন্ন কারিগরি শিক্ষায় শিক্ষিত বেকার যুবকরাও কোয়ালিটি কন্ট্রোল, মেশিন অপারেশন, টেকনিক্যাল মেইনটেন্যান্স, প্রোডাকশন, মার্চেন্ডাইজিংসহ বিভিন্ন বিভাগে নিজেদের কর্মজীবন গড়ার সুযোগ পাবেন।
এর ফলে একদিকে যেমন শিক্ষিত বেকারত্ব কমানোর নতুন পথ তৈরি হবে, অন্যদিকে পোশাকশিল্পও পাবে দক্ষ, প্রশিক্ষিত ও প্রযুক্তিনির্ভর মানবসম্পদ। উৎপাদনশীলতা বাড়বে, পণ্যের গুণগত মান উন্নত হবে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতার সক্ষমতা আরও শক্তিশালী হতে পারে।
তবে শুধু ৩০ হাজার টাকা মজুরি নির্ধারণ করলেই প্রত্যাশিত পরিবর্তন আসবে না। এর পাশাপাশি শ্রমিকদের নিরাপত্তা, স্বাস্থ্যসেবা, আবাসন সুবিধা, কর্মঘণ্টার সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা, দক্ষতা উন্নয়ন এবং মালিক-শ্রমিকের পারস্পরিক আস্থা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে শিল্পপ্রতিষ্ঠানের আর্থিক সক্ষমতা, উৎপাদন ব্যয় ও আন্তর্জাতিক বাজারের প্রতিযোগিতাও বিবেচনায় নিয়ে বাস্তবসম্মত বাস্তবায়ন পরিকল্পনা গ্রহণ করা জরুরি।
আমাদের মনে রাখতে হবে, শ্রমিকের ন্যায্য মজুরি কোনো দয়া বা অনুগ্রহ নয়; এটি তার শ্রমের মর্যাদা ও ন্যায্য অধিকার।
পোশাকশিল্পকে শুধু স্বল্প মজুরির শ্রমনির্ভর শিল্প হিসেবে নয়, বরং শিক্ষিত ও দক্ষ জনশক্তির জন্য একটি সম্মানজনক পেশাগত ক্ষেত্র হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। এতে দেশের বিপুল শিক্ষিত বেকার জনগোষ্ঠীর জন্য নতুন কর্মসংস্থানের দুয়ার খুলবে।
পরিশেষে বলা যায়, পোশাকশিল্পে ন্যূনতম ৩০ হাজার টাকা মজুরির প্রস্তাবকে কেবল শ্রমিকদের বেতন বৃদ্ধির দাবি হিসেবে না দেখে একটি বৃহত্তর অর্থনৈতিক ও সামাজিক সম্ভাবনা হিসেবে বিবেচনা করা উচিত। পরিকল্পিত বাস্তবায়ন, মালিক-শ্রমিকের সহযোগিতা এবং সরকারের কার্যকর উদ্যোগের মাধ্যমে এই খাত হতে পারে শিক্ষিত বেকার যুবকদের কর্মসংস্থান, দক্ষ মানবসম্পদ সৃষ্টি এবং বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতির অন্যতম শক্তিশালী ভিত্তি।
শ্রমিকের মর্যাদা বাড়ুক, শিক্ষিত যুবকের কর্মসংস্থান হোক, সমৃদ্ধ হোক বাংলাদেশের পোশাকশিল্প।
Leave a Reply