
মুহাম্মদ খাইরুল হাসান মামুন জয়েন কনভেনার ( আই. জে. এ)
মূর্তি ও ভাস্কর্য নিয়ে আমাদের সমাজে বিতর্ক নতুন নয়। বিশেষত জাতীয় নেতা, মুক্তিযোদ্ধা কিংবা ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বের প্রতিকৃতি নির্মাণের ক্ষেত্রে প্রশ্ন ওঠে—ইসলামের দৃষ্টিতে এগুলোর বিধান কী? বিষয়টি নির্ধারণে আবেগ কিংবা রাজনৈতিক অবস্থানের পরিবর্তে ধর্মীয় দলিল, যুক্তি ও বাস্তবতা বিবেচনা করা জরুরি।
সাধারণ অর্থে মূর্তি হলো কোনো ব্যক্তি, প্রাণী বা সত্তার ত্রিমাত্রিক প্রতিকৃতি; আর ভাস্কর্য হলো ত্রিমাত্রিক শিল্পকর্ম নির্মাণের শিল্প ও তার ফল। দুটি শব্দের ব্যবহার আলাদা হলেও অর্থের ক্ষেত্রে যথেষ্ট মিল রয়েছে। অতএব, কোনো মূর্তিকে ভাস্কর্য নাম দিলেই তার ধর্মীয় প্রকৃতি বদলে যায় না।
ইসলামে মূর্তিপূজা সুস্পষ্টভাবে নিষিদ্ধ। পাশাপাশি, সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিমে প্রাণীর প্রতিকৃতি নির্মাণ সম্পর্কে বর্ণিত হাদিসের ভিত্তিতে বহু আলেম পূর্ণাঙ্গ মানব ও প্রাণীমূর্তি নির্মাণকেও নিষিদ্ধ বলেছেন। তবে কিছু সমসাময়িক ফতোয়া প্রতিষ্ঠান শিক্ষা, ইতিহাস ও জাদুঘরের মতো ক্ষেত্রে শর্তসাপেক্ষে প্রতিকৃতি ব্যবহারের অবকাশ স্বীকার করেছে। ফলে এ বিষয়ে আলেমদের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে; একে সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত হিসেবে উপস্থাপন করা সঠিক নয়।
এখানে মনে রাখা দরকার, কোনো জাতীয় ব্যক্তিত্বের অবদান স্মরণ করা আর তাঁকে উপাসনা করা এক বিষয় নয়। তবে উপাসনার উদ্দেশ্য না থাকলেও পূর্ণাঙ্গ মানবভাস্কর্য সব অবস্থায় বৈধ—এমন সিদ্ধান্তও সর্বজনস্বীকৃত নয়। তাই ধর্মীয় বিধান নির্ধারণে শুধু নাম নয়, শিল্পকর্মের ধরন, উদ্দেশ্য ও ব্যবহারের প্রেক্ষাপট বিবেচনা করা প্রয়োজন।
জাতীয় ইতিহাস সংরক্ষণ অবশ্যই জরুরি। কিন্তু তার একমাত্র মাধ্যম পূর্ণাঙ্গ মানবভাস্কর্য নয়। স্মৃতিফলক, জাদুঘর, ঐতিহাসিক দলিল, আলোকচিত্র ও তথ্যচিত্রের মাধ্যমেও ইতিহাস ও জাতীয় অবদান যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা সম্ভব।
দুঃখজনকভাবে, এ ধরনের বিতর্ক অনেক সময় রাজনৈতিক বিভাজন ও পারস্পরিক বিদ্বেষের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। ধর্মীয় আপত্তি উত্থাপনকারীকে ইতিহাসবিরোধী বলা যেমন অনুচিত, তেমনি ভাস্কর্য সমর্থনকারী প্রত্যেককে ধর্মবিরোধী আখ্যা দেওয়াও অন্যায়। মতপার্থক্যের ক্ষেত্রে জ্ঞান, শালীনতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধা অপরিহার্য।
আমাদের প্রত্যাশা, মূর্তি ও ভাস্কর্য নিয়ে বিতর্কের সমাধান হোক যুক্তিনির্ভর আলোচনা, ধর্মীয় বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ এবং জাতীয় স্বার্থ বিবেচনার মাধ্যমে। ধর্মীয় অনুভূতির প্রতি শ্রদ্ধা ও ইতিহাস সংরক্ষণের দায়িত্বকে পরস্পরের প্রতিপক্ষ না বানিয়ে গ্রহণযোগ্য পথ খুঁজে বের করাই হোক সমাজ ও রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
Leave a Reply