
সম্পাদকীয়
মুহাম্মদ খায়রুল হাসান মামুন এমবিএ
যুগ্ম আহ্বায়ক, আইযেএ
ডিজিটাল প্রযুক্তির বিস্তারের ফলে তথ্য প্রকাশ ও প্রচারের জগতে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন এসেছে। এখন একটি স্মার্টফোন, ইন্টারনেট সংযোগ আর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের একটি অ্যাকাউন্ট থাকলেই যে কেউ ভিডিও তৈরি করতে পারেন, সংবাদসদৃশ বক্তব্য প্রচার করতে পারেন এবং মুহূর্তের মধ্যে হাজারো মানুষের কাছে পৌঁছে যেতে পারেন। এটি নিঃসন্দেহে তথ্যপ্রযুক্তির ইতিবাচক দিক। কিন্তু এই সুযোগের আড়ালে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন ক্রমেই সামনে আসছে— কনটেন্ট ক্রিয়েশন আর সাংবাদিকতা কি একই বিষয়?
উত্তরটি পরিষ্কার— না, দুটি বিষয় এক নয়। অথচ বর্তমান সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই দুইয়ের সীমারেখা ক্রমেই অস্পষ্ট হয়ে উঠছে। কেউ ভিডিও তৈরি করছেন, কেউ বিভিন্ন ঘটনার ওপর নিজের মতামত দিচ্ছেন, কেউ লাইভে এসে নানা অভিযোগ তুলছেন; আর এর মধ্যেই নিজেদের পরিচয়ের আগে জুড়ে দিচ্ছেন ‘সাংবাদিক’ শব্দটি। ফলে প্রকৃত সাংবাদিকতা, পেশাদার সাংবাদিক এবং দায়িত্বশীল সংবাদমাধ্যমের পরিচয় নিয়ে তৈরি হচ্ছে বিভ্রান্তি।
কনটেন্ট ক্রিয়েশন বলতে বোঝায়— ভিডিও, ছবি, লেখা, বিনোদনমূলক অনুষ্ঠান, মতামত, শিক্ষামূলক উপস্থাপনা কিংবা বিভিন্ন ডিজিটাল উপকরণ তৈরি করে মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া। এর ক্ষেত্র বিস্তৃত এবং সমাজে এর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। একজন কনটেন্ট ক্রিয়েটর সমাজের নানা বিষয় তুলে ধরতে পারেন, জনসচেতনতা তৈরি করতে পারেন, এমনকি অনুসন্ধানী কাজের মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ তথ্যও প্রকাশ করতে পারেন।
অন্যদিকে, সাংবাদিকতার মূল ভিত্তি হলো তথ্য সংগ্রহ, যাচাই, নিরপেক্ষতা, জনস্বার্থ, জবাবদিহি এবং নৈতিক দায়বদ্ধতা। একজন সাংবাদিকের কাজ কেবল ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে কথা বলা কিংবা কোনো ঘটনার ভিডিও ধারণ করা নয়। ঘটনার সত্যতা যাচাই করা, সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের বক্তব্য নেওয়া, তথ্যের উৎস পরীক্ষা করা এবং প্রকাশিত প্রতিবেদনের জন্য দায়বদ্ধ থাকা— এসবই সাংবাদিকতার অপরিহার্য অংশ।
একজন কনটেন্ট ক্রিয়েটর নিজের মতামত প্রকাশ করতে পারেন। কিন্তু সেই মতামতকে যাচাইবিহীন তথ্যের ভিত্তিতে সংবাদ হিসেবে উপস্থাপন করা হলে তা জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করতে পারে। এখানেই পেশাদার সাংবাদিকতার সঙ্গে সাধারণ কনটেন্ট তৈরির মৌলিক পার্থক্য।
বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এমন অনেক ব্যক্তিকে দেখা যায়, যাঁরা নিজেদের সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলেন, ঘটনাস্থলে গিয়ে লাইভ করেন কিংবা নানা ধরনের বক্তব্য প্রচার করেন। তাঁদের কেউ কেউ সাংবাদিকতার ন্যূনতম নীতিমালা অনুসরণ করেন না; তথ্য যাচাই, সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য গ্রহণ কিংবা ব্যক্তিগত গোপনীয়তার প্রতি সম্মান দেখানোর ক্ষেত্রেও উদাসীনতা দেখা যায়।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, সাংবাদিকতার পরিচয় ব্যবহারের ভিত্তি কী? কেবল একটি ক্যামেরা, একটি ফেসবুক পেজ, ইউটিউব চ্যানেল কিংবা একটি পরিচয়পত্রই কি সাংবাদিকতার যথেষ্ট প্রমাণ?
কোনোভাবেই নয়। সাংবাদিকতা একটি দায়িত্বশীল পেশাগত কর্মকাণ্ড। একটি সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে কাজ করা, সংবাদ সংগ্রহ ও সম্পাদনার প্রক্রিয়ায় যুক্ত থাকা, তথ্য যাচাইয়ের নীতি অনুসরণ করা এবং পেশাগত আচরণবিধি মেনে চলা— এসব বিষয় একজন সাংবাদিকের বিশ্বাসযোগ্যতা নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ।
তবে এটিও মনে রাখতে হবে, সাংবাদিক হতে হলে নির্দিষ্ট একটি শিক্ষাগত ডিগ্রি থাকতেই হবে— এমন সর্বজনীন শর্ত নেই। সাংবাদিকতা বিষয়ে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু শিক্ষাগত যোগ্যতা না থাকার অর্থই কেউ সাংবাদিক হতে পারবেন না, এমন সিদ্ধান্তও সঠিক নয়। প্রকৃত বিবেচ্য হলো দক্ষতা, সততা, প্রশিক্ষণ, পেশাগত দায়িত্ববোধ এবং সাংবাদিকতার নীতিমালা অনুসরণ করার মানসিকতা।
সমস্যা শিক্ষাগত সনদ না থাকার চেয়েও বড় তখনই হয়, যখন কেউ কোনো ধরনের পেশাগত প্রস্তুতি, নৈতিক দায়বদ্ধতা কিংবা তথ্য যাচাইয়ের প্রক্রিয়া ছাড়াই নিজেকে সাংবাদিক দাবি করেন এবং সেই পরিচয়কে ব্যক্তিগত প্রভাব বিস্তার বা অন্য কোনো স্বার্থসিদ্ধির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেন।
সাংবাদিকতার পরিচয় ব্যবহার করে যাচাইবিহীন অভিযোগ প্রচার, ব্যক্তিগত বিরোধকে সংবাদে রূপ দেওয়া, কারও সম্মানহানি করা কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভয়ভীতি সৃষ্টির প্রবণতা শুধু সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির ক্ষতি করে না; বরং সাংবাদিকতা পেশার সামগ্রিক বিশ্বাসযোগ্যতাকেও প্রশ্নবিদ্ধ করে।
একজন দায়িত্বহীন ব্যক্তির কর্মকাণ্ডের জন্য যখন সাধারণ মানুষ পুরো সাংবাদিক সমাজকে সন্দেহের চোখে দেখতে শুরু করেন, তখন প্রকৃত সাংবাদিকরাও ক্ষতিগ্রস্ত হন। তাঁদের দীর্ঘদিনের শ্রম, ঝুঁকি গ্রহণ, তথ্য অনুসন্ধান এবং জনস্বার্থে কাজ করার মূল্যায়ন ম্লান হয়ে যায়।
এখানে আরেকটি বিপজ্জনক প্রবণতা হলো— জনপ্রিয়তাকে বিশ্বাসযোগ্যতার মাপকাঠি হিসেবে বিবেচনা করা। একটি ভিডিও লাখোবার দেখা হয়েছে বলেই তার বক্তব্য সত্য হয়ে যায় না। অনুসারীর সংখ্যা বেশি হলেই কেউ সাংবাদিক হয়ে যান না। একইভাবে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে ব্যাপক প্রচার চালানো হলেই অভিযোগটি প্রমাণিত হয়ে যায় না।
ভিউ, লাইক ও শেয়ার জনপ্রিয়তার সূচক হতে পারে; কিন্তু সত্যতা ও পেশাগত বিশ্বাসযোগ্যতার বিকল্প নয়।
এই আলোচনার অর্থ কখনোই এমন নয় যে কেবল প্রতিষ্ঠিত সংবাদমাধ্যমের কর্মীরাই সমাজের সমস্যা তুলে ধরবেন। নাগরিক সাংবাদিকতা, স্বাধীন সাংবাদিকতা এবং সাধারণ মানুষের মতপ্রকাশের অধিকার গণতান্ত্রিক সমাজের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। একজন সাধারণ নাগরিকও কোনো অনিয়মের তথ্য প্রকাশ করতে পারেন, দুর্নীতির প্রমাণ সামনে আনতে পারেন কিংবা জনস্বার্থে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার ভিডিও ধারণ করতে পারেন।
কিন্তু নাগরিক হিসেবে তথ্য প্রকাশ করা এবং নিজেকে পেশাদার সাংবাদিক হিসেবে পরিচয় দেওয়া এক বিষয় নয়। যে কেউ সংবাদমূল্যসম্পন্ন তথ্য প্রকাশ করতে পারেন; তবে সেই তথ্যকে সংবাদ হিসেবে উপস্থাপন করার সময় সত্যতা যাচাই, নিরপেক্ষতা এবং দায়বদ্ধতার নীতিগুলো অনুসরণ করা জরুরি।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে স্বাধীনভাবে কাজ করার অধিকার যেমন রয়েছে, তেমনি সেই স্বাধীনতার সঙ্গে দায়িত্বও যুক্ত। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা কখনোই মিথ্যা তথ্য প্রচার, মানহানি কিংবা অন্যের অধিকার লঙ্ঘনের অবাধ অনুমতি নয়।
এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য প্রথমেই প্রয়োজন সাংবাদিকতার পেশাগত পরিচয় ও নৈতিক মানদণ্ড সম্পর্কে সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি। সংবাদমাধ্যমগুলোর উচিত তাদের পরিচয়, কর্মী ও প্রকাশিত প্রতিবেদনের বিশ্বাসযোগ্যতা সম্পর্কে স্বচ্ছ থাকা। সাংবাদিকদের প্রশিক্ষণ, তথ্য যাচাই, সংশোধনী প্রকাশ এবং অভিযোগ নিষ্পত্তির কার্যকর ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করা জরুরি।
একই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্ল্যাটফর্ম, সংশ্লিষ্ট পেশাজীবী সংগঠন এবং গণমাধ্যমের নীতিনির্ধারকদেরও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। তবে সাংবাদিকতার পরিচয় নিয়ে বিভ্রান্তি দূর করার নামে যেন স্বাধীন মতপ্রকাশের অধিকার সংকুচিত না হয়, সেদিকেও সতর্ক থাকতে হবে।
কাউকে শুধু শিক্ষাগত যোগ্যতা, সংবাদমাধ্যমের পরিচয়পত্র কিংবা প্রাতিষ্ঠানিক সংযুক্তির অভাবের কারণে অপসাংবাদিক বলে চিহ্নিত করা উচিত নয়। বরং তাঁর কাজের পদ্ধতি, তথ্যের নির্ভুলতা, নৈতিক আচরণ এবং জবাবদিহির ভিত্তিতে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।
সাংবাদিকতা কোনো পদবি নয়, যা ইচ্ছা করলেই নামের আগে বসিয়ে দেওয়া যায়। এটি একটি দায়িত্ব, একটি নৈতিক অঙ্গীকার এবং জনগণের কাছে সত্য তুলে ধরার এক গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক ভূমিকা। একইভাবে, কনটেন্ট ক্রিয়েশনও একটি স্বতন্ত্র ও সম্মানজনক কার্যক্রম; তাকে ছোট করে দেখার কোনো কারণ নেই।
সমস্যা কনটেন্ট ক্রিয়েশনে নয়, সমস্যা তখনই, যখন কনটেন্ট তৈরির পরিচয়কে সাংবাদিকতার সঙ্গে গুলিয়ে ফেলা হয়, কিংবা সাংবাদিকতার মর্যাদাকে ব্যক্তিগত প্রচার, প্রভাব বিস্তার ও অনৈতিক সুবিধা অর্জনের হাতিয়ার বানানো হয়।
আজ সময় এসেছে এই বিভ্রান্তি দূর করার। কনটেন্ট ক্রিয়েটর তাঁর পরিচয়ে সম্মানিত হবেন, সাংবাদিক তাঁর পেশাগত সততা ও কাজের মানে স্বীকৃতি পাবেন— এটাই হওয়া উচিত একটি সুস্থ গণতান্ত্রিক সমাজের প্রত্যাশা।
মনে রাখতে হবে, ক্যামেরার সামনে দাঁড়ালেই সাংবাদিক হওয়া যায় না, সংবাদ প্রচার করলেই সাংবাদিকতার দায়িত্ব পালন হয় না। সাংবাদিকতার প্রকৃত পরিচয় নির্ধারিত হয় সত্য অনুসন্ধান, তথ্যের নির্ভুলতা, নৈতিকতা এবং জনস্বার্থের প্রতি অঙ্গীকারের মাধ্যমে।
সাংবাদিকতার মর্যাদা রক্ষা করা শুধু সাংবাদিকদের দায়িত্ব নয়; এটি সত্যনিষ্ঠ তথ্যপ্রবাহ ও সুস্থ সমাজ গঠনে বিশ্বাসী প্রতিটি মানুষের দায়িত্ব।
Leave a Reply