
বাংলাদেশে পোলট্রি শিল্পের ব্যাপক সম্প্রসারণের সঙ্গে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ মুরগির বিষ্ঠা ও poultry litter উৎপন্ন হচ্ছে। কয়েক বছর আগের একটি বাংলাদেশি গবেষণায় দৈনিক প্রায় ১৮ হাজার মেট্রিক টন poultry litter উৎপাদনের হিসাব পাওয়া যায়; গাজীপুরের জন্যও প্রায় ১,৬০০ টন/দিন উল্লেখ করা হয়েছিল।
কিন্তু ২০২৬ সালের বাস্তব পরিস্থিতিতে জাতীয়ভাবে বর্তমানে কত টন মুরগির বর্জ্য উৎপন্ন হচ্ছে—এ বিষয়ে একটি নির্ভরযোগ্য, হালনাগাদ সরকারি জরিপ কি আমাদের আছে?
থাকার কথা। কারণ এটি শুধু খামারির বর্জ্য নয়; এটি খাদ্যনিরাপত্তা, পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের প্রশ্ন।
কাঁচা মুরগির বিষ্ঠা কি নিরাপদ?
মুরগির বিষ্ঠা নিজে কোনো ‘বিষ’ নয়। সঠিকভাবে প্রক্রিয়াজাত করলে এটি মূল্যবান জৈবসার এবং বায়োগ্যাসের কাঁচামাল হতে পারে।
সমস্যা শুরু হয় যখন কাঁচা বা অপর্যাপ্তভাবে প্রক্রিয়াজাত poultry manure সরাসরি কৃষিজমি কিংবা মাছের পুকুরে ব্যবহার করা হয়।
গবেষণায় poultry litter-এ Salmonella, Campylobacter, E. coli, Listeriaসহ বিভিন্ন রোগজীবাণুর উপস্থিতি নথিভুক্ত হয়েছে। অপর্যাপ্ত ব্যবস্থাপনায় এসব জীবাণু পরিবেশ ও খাদ্য উৎপাদন ব্যবস্থায় ছড়িয়ে পড়ার সুযোগ পেতে পারে।
বিশেষ করে যেসব শাকসবজি মাটির সংস্পর্শে থাকে, কন্দজাতীয় ফসল এবং অপরিশোধিত জৈবসার ব্যবহৃত কৃষিজমির উৎপাদিত খাদ্যের ক্ষেত্রে foodborne pathogen নিয়ন্ত্রণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এখানে আতঙ্ক ছড়ানোর প্রয়োজন নেই; প্রয়োজন ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা।
মাছের পুকুরে মুরগির বিষ্ঠা—প্রশ্নটা আরও গুরুত্বপূর্ণ
বাংলাদেশে integrated fish-poultry farming-এর ঐতিহাসিক ব্যবহার রয়েছে। FAO-এর বাংলাদেশবিষয়ক ম্যানুয়ালেও মাছ চাষে প্রাণীর বর্জ্য ব্যবহারের বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে সেখানে এমন চাষব্যবস্থা নিয়ে ভোক্তাদের উদ্বেগের কথাও নথিভুক্ত আছে।
তাই প্রশ্ন হওয়া উচিত—
মুরগির বিষ্ঠা পুকুরে দেওয়া যাবে কি না—শুধু এটুকু নয়; কী ধরনের বর্জ্য, কীভাবে প্রক্রিয়াজাত, কত পরিমাণে, কী পানিতে এবং কী পরিবেশগত শর্তে দেওয়া হচ্ছে?
অর্থাৎ, ‘সস্তা’ বলে ব্যবহার নয়; বৈজ্ঞানিকভাবে নিরাপদ কি না—সেটিই হতে হবে সিদ্ধান্তের ভিত্তি।
সবচেয়ে উপেক্ষিত বিষয়: অ্যান্টিবায়োটিক ও AMR
পোলট্রি উৎপাদনে ব্যবহৃত কিছু অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল ও অ্যান্টিবায়োটিকের অবশিষ্টাংশ এবং antibiotic-resistance genes মুরগির বর্জ্যের সঙ্গে পরিবেশে যেতে পারে।
FAO-ও দায়িত্বশীলভাবে poultry production-এ অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে।
আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো—গবেষণায় দেখা গেছে composting-এর মাধ্যমে অনেক প্যাথোজেন, অ্যান্টিবায়োটিক এবং কিছু antibiotic-resistance gene কমতে পারে; কিন্তু ফলাফল সব উপাদানের ক্ষেত্রে একই নয়।
অর্থাৎ,
“কম্পোস্ট করেছি, তাই সব দূষণ শেষ”—এমন ধারণা বৈজ্ঞানিকভাবে ঠিক নয়।
Heavy metal-এর ব্যাপারটি আরও জটিল
মুরগির খাদ্য ও উৎপাদন ব্যবস্থার মাধ্যমে **Copper (Cu), Zinc (Zn)**সহ কিছু ধাতু poultry manure-এ জমা হতে পারে। ২০২৪ সালের একটি বিস্তৃত পর্যালোচনায় livestock manure compost-এ heavy metals এবং antibiotics-এর অবশিষ্টতা ও জমিতে প্রয়োগের সম্ভাব্য পরিবেশগত ঝুঁকি নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে।
আর এখানে একটি মৌলিক পার্থক্য মনে রাখা দরকার:
প্যাথোজেন জীবিত জীব—তাপ ও সঠিক composting ব্যবস্থায় তাদের সংখ্যা ব্যাপকভাবে কমানো যায়।
কিন্তু—
ভারী ধাতু জীবাণুর মতো ‘মরে যায়’ না।
তাই composting-এর পাশাপাশি প্রয়োজন রাসায়নিক পরীক্ষা, মাননিয়ন্ত্রণ এবং প্রয়োগের সীমা নির্ধারণ।
তাহলে সমাধান কী?
মুরগির বিষ্ঠা নিষিদ্ধ করে সমস্যার সমাধান হবে না। বরং এটিকে একটি circular economy resource হিসেবে ব্যবস্থাপনা করতে হবে।
প্রয়োজন—
১. খামার পর্যায়ে বর্জ্য সংগ্রহ ও সংরক্ষণের মানদণ্ড।
২. বৈজ্ঞানিক composting বা anaerobic digestion ব্যবস্থা।
৩. pathogen reduction-এর জন্য নির্দিষ্ট temperature-time protocol।
৪. বাজারজাত compost-এর pathogen, heavy metal ও প্রয়োজনীয় chemical testing।
৫. মাছের পুকুরে raw poultry manure ব্যবহারের বিষয়ে সুস্পষ্ট বৈজ্ঞানিক guideline।
৬. poultry sector-এ antibiotic stewardship এবং AMR monitoring।
৭. কৃষক ও খামারিদের প্রশিক্ষণ।
৮. কৃষিজমি ও মাছের উৎপাদন থেকে food-safety surveillance।
৯. এবং সর্বোপরি—একটি জাতীয় Poultry Waste Management Policy।
শেষ প্রশ্নটি আমাদের সবার
আমরা উন্নয়নের কথা বলি। খাদ্য উৎপাদন বাড়ানোর কথা বলি। মাছ ও মাংসে স্বয়ংসম্পূর্ণতার কথা বলি।
কিন্তু একই সঙ্গে যদি আমাদের উৎপাদন ব্যবস্থার বর্জ্য ব্যবস্থাপনা অপ্রতুল থাকে, তাহলে প্রশ্ন থেকেই যায়—
আমরা শুধু কত খাদ্য উৎপাদন করছি, নাকি কতটা নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন করছি?
প্রতিদিন হাজার হাজার টন poultry waste উৎপন্ন হচ্ছে—এই বাস্তবতার সামনে আমাদের এখন আর চোখ বন্ধ করে থাকার সুযোগ নেই।
এটি কোনো খামারি বনাম ভোক্তার বিষয় নয়।
এটি কৃষক, খামারি, মৎস্যচাষি, ভোক্তা, পরিবেশ এবং রাষ্ট্র—সবার যৌথ দায়িত্ব।
আর ব্যক্তিগত নৈতিকতার জায়গা থেকেও একটি কথা মনে রাখা দরকার—
নামাজ পড়া যেমন গুরুত্বপূর্ণ, মানুষের হক রক্ষা করাও তেমনি গুরুত্বপূর্ণ।
ইবাদত যেমন গুরুত্বপূর্ণ, আমানতদারিও তেমনি গুরুত্বপূর্ণ।
মানুষের খাবার, পানি ও পরিবেশকে অনিরাপদ করে তারপর শুধু ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতার মাধ্যমে নিজের দায় শেষ হয়েছে মনে করা কোনো সুস্থ নৈতিকতার পরিচয় হতে পারে না।
আমাদের দরকার এমন বাংলাদেশ—
যেখানে ধর্ম থাকবে, নৈতিকতা থাকবে;
উন্নয়ন থাকবে, কিন্তু নিরাপদ খাদ্যও থাকবে;
পোলট্রি শিল্প থাকবে, কিন্তু তার বর্জ্য ব্যবস্থাপনাও থাকবে;
সস্তা উৎপাদন থাকবে, কিন্তু মানুষের স্বাস্থ্যের বিনিময়ে নয়।
কারণ উন্নয়নের শেষ কথা উৎপাদনের পরিমাণ নয়—
মানুষের জীবন কতটা নিরাপদ, সেটিও উন্নয়নের মাপকাঠি।
মুহাম্মদ খায়রুল হাসান মামুন
গাজীপুৱ
তথ্য সরবরাহকারী নিউজ এজেন্সি ভাষাটিভি
Leave a Reply