1. online@bhashatv.com : বার্তা বিভাগ : বার্তা বিভাগ
  2. admin@bhashatv.com : admin :
বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৬:২৯ পূর্বাহ্ন

টক খাবারের প্রতি আকর্ষণ—ছেলে না মেয়ে, নাকি রুচির বিজ্ঞান?

Reporter Name
  • বুধবার, ১৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ৩১ পাঠ করা হয়েছে

মুহাম্মদ খায়রুল হাসান মামুন: লেবু, কাঁচা আম, আমড়া, তেঁতুল, বরই, কামরাঙা কিংবা টক দই—টক জাতীয় খাবারের প্রতি মানুষের আকর্ষণ বহু পুরোনো। বাংলাদেশের খাদ্যসংস্কৃতিতে তো টক স্বাদের আলাদা একটি অবস্থান রয়েছে। ভর্তা, ডাল, মাছ, সালাদ কিংবা ফল—অনেক খাবারের সঙ্গে একটু লেবু বা টক উপাদান খাবারের স্বাদই যেন বদলে দেয়।

কিন্তু একটি মজার প্রশ্ন প্রায়ই শোনা যায়—টক খাবার কি ছেলেদের তুলনায় মেয়েরা বেশি পছন্দ করেন? বিশেষ করে গর্ভাবস্থায় কোনো নারী টক খাবারের প্রতি আকৃষ্ট হলে তা নিয়ে নানা ধরনের লোকবিশ্বাসও প্রচলিত রয়েছে। বিজ্ঞান এ বিষয়ে কী বলে?

উত্তরটি বেশ পরিষ্কার—টক খাবার পছন্দ করার সঙ্গে ব্যক্তির ছেলে বা মেয়ে হওয়ার সরাসরি ও সর্বজনীন সম্পর্কের প্রমাণ নেই। বরং খাদ্যপছন্দ একটি জটিল বিষয়, যেখানে ব্যক্তিগত রুচি, জেনেটিক বৈশিষ্ট্য, স্বাদগ্রহণের সংবেদনশীলতা, খাদ্যাভ্যাস, সংস্কৃতি ও শারীরবৃত্তীয় অবস্থার ভূমিকা রয়েছে।

বিজ্ঞানীরা টক স্বাদকে খাবারে থাকা অ্যাসিডের সঙ্গে সম্পর্কিত একটি মৌলিক স্বাদ হিসেবে বিবেচনা করেন। লেবুতে সাইট্রিক অ্যাসিড, ভিনেগারে অ্যাসিটিক অ্যাসিড এবং দইয়ে ল্যাকটিক অ্যাসিডের মতো বিভিন্ন অ্যাসিড রয়েছে।

আমরা যখন এসব খাবার খাই, তখন অ্যাসিড থেকে আসা হাইড্রোজেন আয়ন বা প্রোটন মুখের বিশেষ স্বাদগ্রাহী কোষকে উদ্দীপিত করে। আধুনিক গবেষণায় OTOP1 নামের একটি প্রোটন-চ্যানেলকে টক স্বাদ শনাক্ত করার গুরুত্বপূর্ণ রিসেপ্টর হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। গবেষণায় দেখা গেছে, টক স্বাদের সংকেত তৈরিতে এই চ্যানেলের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।

অর্থাৎ, টক খাবার মুখে দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে একটি জটিল রাসায়নিক ও স্নায়বিক প্রক্রিয়া শুরু হয়। স্বাদগ্রাহী কোষ উদ্দীপিত হয়, স্নায়ুর মাধ্যমে সংকেত মস্তিষ্কে পৌঁছায় এবং আমরা ‘টক’ স্বাদ অনুভব করি।

একই লেবু একজনের কাছে অত্যন্ত টক, অন্যজনের কাছে আবার বেশ উপভোগ্য হতে পারে। এর কারণ মানুষের স্বাদগ্রহণের ক্ষমতা ও সংবেদনশীলতা এক নয়।

কারও স্বাদগ্রাহী কোষ অ্যাসিডের প্রতি তুলনামূলক বেশি সংবেদনশীল হতে পারে। আবার কারও ক্ষেত্রে একই মাত্রার টক স্বাদ কম তীব্র বলে মনে হতে পারে। এর সঙ্গে জেনেটিক পার্থক্য, খাদ্যাভ্যাস এবং দীর্ঘদিনের অভ্যাসও যুক্ত হতে পারে।

তাছাড়া খাবারের সঙ্গে লবণ, মরিচ, চিনি বা অন্যান্য মসলা যুক্ত হলে টক স্বাদের অভিজ্ঞতাও বদলে যায়। ফলে ‘টক পছন্দ’ শুধু জিহ্বার একটি সংকেত নয়; এর সঙ্গে পুরো খাবারের স্বাদ ও ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাও জড়িত।

সমাজে প্রচলিত ধারণা আছে যে নারীরা, বিশেষ করে গর্ভবতী নারীরা, টক খাবার বেশি পছন্দ করেন। কিন্তু এটিকে নারী-পুরুষের একটি সার্বজনীন জৈবিক বৈশিষ্ট্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার মতো শক্তিশালী বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই।

অর্থাৎ কোনো নারী টক বেশি পছন্দ করেন বলেই তিনি নারী হিসেবে একটি নির্দিষ্ট জৈবিক বৈশিষ্ট্যের অধিকারী—এমন সিদ্ধান্ত টানা ঠিক নয়। একইভাবে অনেক পুরুষও টক খাবারের বড় ভক্ত। খাদ্যপছন্দের ক্ষেত্রে ব্যক্তিভেদে পার্থক্যই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

টক খাবারের প্রসঙ্গ উঠলেই গর্ভাবস্থার কথা আসে। গর্ভাবস্থায় অনেক নারীর স্বাদ ও গন্ধের অনুভূতিতে পরিবর্তন দেখা দিতে পারে। ফলে কোনো কোনো খাবারের প্রতি আকর্ষণ বেড়ে যেতে পারে, আবার আগে পছন্দের খাবারও অপছন্দ হতে পারে।

এ ধরনের পরিবর্তনের পেছনে গর্ভাবস্থার শারীরবৃত্তীয় ও হরমোনগত পরিবর্তনের ভূমিকা থাকতে পারে। তবে সব গর্ভবতী নারীর ক্ষেত্রে একই অভিজ্ঞতা হয় না।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—টক খেতে ইচ্ছা করা শিশুর লিঙ্গের নির্ভরযোগ্য পূর্বাভাস নয়।

আমাদের সমাজে কখনো বলা হয়, গর্ভবতী নারী টক খেতে চাইলে মেয়ে সন্তান হতে পারে, আবার অন্য কোনো খাবারের প্রতি আকর্ষণকে ছেলে সন্তানের সঙ্গে যুক্ত করা হয়। এসব ধারণা লোকজ বিশ্বাস হিসেবে থাকতে পারে, কিন্তু এগুলোকে বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা-নিরীক্ষায় প্রতিষ্ঠিত সত্য হিসেবে গ্রহণ করার সুযোগ নেই।

টক খাবারের প্রতি আকর্ষণের পেছনে একটি শারীরবৃত্তীয় বৈশিষ্ট্যও রয়েছে। অ্যাসিড মুখের স্বাদগ্রাহী কোষকে সক্রিয় করার পাশাপাশি মুখের অন্যান্য সংবেদনশীল স্নায়ুতন্ত্রকেও প্রভাবিত করতে পারে। ফলে টক খাবার অনেক সময় শুধু ‘স্বাদ’ নয়, একটি তীব্র ও সতেজ অনুভূতিও তৈরি করে।

এই কারণেই গরমের দিনে এক গ্লাস লেবুর শরবত কিংবা খাবারের সঙ্গে লেবুর টুকরা অনেকের কাছে বিশেষ আকর্ষণীয় মনে হয়।

বাংলাদেশ, ভারত ও দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে টক খাবারের ব্যবহার অত্যন্ত বৈচিত্র্যময়। কাঁচা আমের ভর্তা, তেঁতুলের চাটনি, আমড়া, বরই, কামরাঙা কিংবা লেবু—এসব খাবারের প্রতি মানুষের ভালোবাসা শুধু শরীরবিজ্ঞানের ফল নয়; এটি খাদ্যসংস্কৃতিরও অংশ।

একটি শিশু ছোটবেলা থেকে যে ধরনের খাবার খেয়ে বড় হয়, ভবিষ্যতে তার খাদ্যপছন্দে সেই অভ্যাসের প্রভাব পড়তে পারে। ফলে একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলের মানুষ কোনো স্বাদকে বেশি পছন্দ করলেও সেটিকে শুধু জৈবিক পার্থক্য দিয়ে ব্যাখ্যা করা ঠিক নয়।

বিজ্ঞানের বর্তমান ধারণা অনুযায়ী, টক স্বাদ শনাক্ত করার একটি সুস্পষ্ট জৈবিক প্রক্রিয়া রয়েছে; কিন্তু টক খাবার কে বেশি পছন্দ করবেন, তা নির্ধারণের ক্ষেত্রে ছেলে-মেয়ে একটি একক বা নির্ভরযোগ্য ব্যাখ্যা নয়।

টক স্বাদের ক্ষেত্রে OTOP1 প্রোটন-চ্যানেলের ভূমিকা সম্পর্কে আমাদের জ্ঞান গত কয়েক বছরে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। গবেষণায় দেখা গেছে, অ্যাসিডের প্রোটন স্বাদগ্রাহী কোষে প্রবেশ করে বৈদ্যুতিক পরিবর্তন ঘটাতে পারে এবং সেই সংকেত স্নায়ুর মাধ্যমে মস্তিষ্কে পৌঁছায়।

অর্থাৎ টক খাওয়ার অনুভূতির পেছনে বিজ্ঞান অত্যন্ত পরিষ্কার; কিন্তু টক খাওয়ার ‘পছন্দের’ পেছনে শুধু ছেলে-মেয়ের পার্থক্য দিয়ে কোনো সহজ সূত্র তৈরি করা যায় না।

টক খাবারের প্রতি ভালোবাসা মানুষের রুচির এক চমৎকার বৈচিত্র্য। কেউ লেবু ছাড়া খাবার ভাবতেই পারেন না, কেউ আবার তেঁতুল বা কাঁচা আমের টক দেখলেই জিভে পানি চলে আসে। আবার কেউ টক স্বাদ একেবারেই সহ্য করতে পারেন না।

তাই টক খাবার বেশি পছন্দ করলে তাকে ‘ছেলেদের স্বভাব’ বা ‘মেয়েদের স্বভাব’ হিসেবে দেখার চেয়ে মানুষের ব্যক্তিগত রুচি, অভ্যাস, সংস্কৃতি এবং স্বাদগ্রহণের জৈবিক বৈচিত্র্য হিসেবে দেখা বেশি বৈজ্ঞানিক।

আর গর্ভবতী নারীর টক খাবারের প্রতি আকর্ষণকে ঘিরে যে ছেলে-মেয়ে নির্ধারণের নানা গল্প প্রচলিত আছে, সেগুলোকে কৌতূহল বা লোকসংস্কৃতির অংশ হিসেবে দেখা যেতে পারে—কিন্তু শিশুর লিঙ্গ নির্ধারণের বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি হিসেবে নয়।

শেষ পর্যন্ত সত্যিটা খুব সহজ—টক পছন্দের কোনো লিঙ্গ নেই; রুচির আছে বৈচিত্র্য, আর সেই বৈচিত্র্যের পেছনে রয়েছে জিহ্বা থেকে মস্তিষ্ক পর্যন্ত বিস্তৃত এক অসাধারণ বিজ্ঞান।

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই ক্যাটাগরীর আরো খবর
  • All rights reserved © bhashatv.com
Design By Raytahost