১৯৭১ মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় যে গণহত্যা হয়েছিল, সেটি কেবল একটা ফৌজদারি অপরাধ ছিল না। আওয়ামী লীগ এই অপরাধকে মানবতাবিরোধী অপরাধ এর বিচার আখ্যায়িত করে একে ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে বিচার করতে চেয়েছে। এর রাজনৈতিক দিক উপেক্ষা করে একটা ত্রুটিপূর্ণ বিচার করে রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের উদ্দেশ্যে একে ব্যবহার করেছে তারা। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে যারা বিরোধিতা করেছে তাদের সাথে মীমাংসাটি একটি রাজনৈতিক প্রশ্ন। রাজনৈতিক প্রশ্নের মীমাংসা কেবলমাত্র ফৌজদারি অপরাধের বিচার দিয়ে হতে পারে না। রাজনৈতিক প্রশ্নের মীমাংসা করার জন্য সেই সময়ের রাজনীতিটাকে গুরুত্বের সাথে দেখতে হবে। তখনকার দলগুলোর রাজনৈতিক অবস্থানকে চিহ্নিত করা এবং দল হিসেবে তাদের ভূমিকা চিহ্নিত করা এখানে জরুরি ছিল। রাজনৈতিকভাবেই কারা এখানে মতাদর্শিকভাবে এবং সক্রিয় উপায়ে কারা এই গণহত্যার সাথে জড়িত ছিল, সেটা চিহ্নিত করে তাদের বিচার একভাবে হবে; অন্যদিকে ফৌজদারি অপরাধের বিচার অন্যভাবে হবে।
আরেকটি বিষয় হচ্ছে, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে যারা অপরাধ করেছিল, তাদের একটা বিচারপ্রক্রিয়া শুরু হয়েও বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। বহু বছর পরে আবার বিচার প্রক্রিয়া শুরু হয়। ততদিনে অনেক সাক্ষী এমনকি মারাও গেছেন। ফলে সঠিক সময়ে শুরু হলে এই বিচার প্রক্রিয়া যেভাবে যথার্থভাবে হতে পারত, সেটা হয়নি। বরং এত দেরিতে বিচারকাজ শুরু করায় অনেকগুলো প্রতিবন্ধকতা তৈরি হয়েছে। ফলে এমন অনেক তথ্য ও সাক্ষীর ওপর নির্ভর করতে হয়েছে, যেগুলোর ওপর ভর করে আসলে সঠিক বিচার প্রক্রিয়া চালনোই সম্ভব নয়। এগুলোর সাথে যুক্ত হয়েছে সাক্ষী উধাও হয়ে যাওয়া কিংবা স্কাইপ কেলেঙ্কারির মত ঘটনা। ফলে এখানে ন্যায়বিচার বদলে বিতর্কিত বিচার চলেছে।
এভাবে এই ধরনের বিচার প্রক্রিয়া চালানোর কারণে আজকে এসে দেখা যাচ্ছে, এই প্রক্রিয়ায় বিচার চিহ্নিত যুদ্ধাপরাধীদেরকে হয় সর্বোচ্চ শাস্তি নয় বেকসুর খালাস দুই চরম অবস্থায় উঠানামা করতে।
এই বিচার প্রক্রিয়ায় প্রসিকিউটর নিয়োগ ও কনফ্লিক্ট অফ ইন্টারেস্ট তথা স্বার্থের সংঘাত মোকাবেলায় সরকারের দায়িত্বশীলতার ঘাটতি দেখা গিয়েছে। বাংলাদেশের সংস্কৃতিতে বিচারব্যবস্থাকে রাজনীতিকিকরণ করার বহু চেষ্টা আমরা দেখেছি। রাজনৈতিক দল, বিশেষ করে ক্ষমতাসীনদের হাত ধরে এখানে ন্যায়বিচারে বিচ্যুতি ঘটানো হয়। একারণে জনগণ এখানে ন্যায়বিচার পান না। এই সংস্কৃতিই এখানে প্রতিষ্ঠিত।
একারণেই আমরা বহু বছর ধরেই, বিচার বিভাগের সংস্কারের কথা বলে আসছি। সম্প্রতি বিচার বিভাগে যে সংস্কার প্রস্তাব এসেছে সেখানেও রাজনৈতিক দলগুলো তাদের মতামত দিয়েছে। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা প্রশ্নে বেশিরভাগ রাজনৈতিক দলই মোটাদাগে ঐকমত্য পোষণ করেছে। এই বিচার বিভাগের সংস্কার ও বিচার বিভাগকে স্বাধীন না করতে পারলে এভাবেই বিচার বিভাগে রাজনীতিকিকরণ দেখে যেতে হবে। এ থেকে মুক্তির জন্য বিচার বিভাগের সম্পূর্ণ খোল নলচে বদল ঘটানো দরকার। বিচার বিভাগের স্বাধীন জায়গা তৈরি করা দরকার। এখানে নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষের বদল হওয়া দরকার। এসব বিষয়েই আমরা কথা বলছি, এবং এই বিষয়গুলো খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
বিচারের রাজনৈতিক দিকটা বিবেচনা করলে এবং প্রত্যেকের ব্যক্তিগত ভুমিকা অনুযায়ী বিচারের ভিত্তিতে নানা ধরনের শাস্তির ব্যবস্থা নিশ্চিত করা গেলে ফাঁসি দেওয়ার উপযুক্ত প্রমাণের অভাবে বেকসুর খালাস দেওয়ার যে উদাহরণ তৈরি হয়েছে তা হতো না। কেউ যদি ১৩-১৪ বছর এখানে কারাভোগ করে এবং এর মানে যদি এই হয় যে, রাজনৈতিক অপরাধ হিসেবে সে এই সাজা পেয়েছে, তাহলে হয়তো রাজনৈতিক অপরাধের শাস্তি হিসেবে একে বিবেচনা করে তাকে মুক্তি দেওয়ার বিষয়টি আসতে পারত। কিন্তু এখন এই বিচার প্রক্রিয়াকে নিয়ে যাওয়া হয়েছে এই জায়গায়, যে, হয় ফাঁসি নাহয় খালাস। কাউকে ফাঁসি দেওয়ার মতো যথাযথ প্রমাণ পাওয়া না গেলে তাকে খালাস- এরকম একটি জায়গা তৈরি হয়েছে, এবং এই প্রক্রিয়া তৈরির জন্য আওয়ামী লীগই দায়ী। আজকের ঘটনার দায় আওয়ামী লীগ এড়াতে পারে না।
আরেকটি ভয়ঙ্কর বিষয় হলো, এই রায়ের বিরুদ্ধে দেশের কোনো মানুষ প্রতিবাদ জানালে তার ওপর হামলা হওয়া। আওয়ামী লীগ যেভাবে চালিয়েছে, সেভাবে এখন অন্য কেউ চালাতে চাচ্ছে। বিচারের রায়ে কেউ সংক্ষুব্ধ হলে তাকে কথা বলতে না দিয়ে তার ওপর হামলা চালানো হচ্ছে। এখানে নতুন করে এক বাইনারি তৈরি হচ্ছে। আওয়ামী লীগ যেমন মুক্তিযুদ্ধ বনাম ইসলাম, মুসলমান বনাম বাঙালি ইত্যাদি ধরনের বাইনারি তৈরি করেছিল, এখন আবার শাহবাগের পক্ষে-বিপক্ষে বাইনারি তৈরি করা হচ্ছে। এই বাইনারিগুলোর মধ্যে দিয়ে বাংলাদেশ কোনো নতুন জায়গায় পৌছাতে পারবে না । বিভাজনের রাজনীতি ফ্যাসিবাদকে আমন্ত্রণ করে, এ ব্যাপারে আমাদের সতর্ক থাকা দরকার। বিভিন্ন জায়গায় যে হামলা হয়েছে, তার আমরা তীব্র নিন্দা জানাই।
আমরা সুস্পষ্টভাবে বলি, এই বিচারপ্রক্রিয়ার ত্রুটিগুলো ২০২৪ এর গণঅভ্যুত্থানের অর্জন বা ব্যর্থতা নয়, এগুলো বরং আওয়ামী লীগের কর্মকান্ডের পরিণতি। আওয়ামী লীগের বিভাজনের রাজনীতির বিপরীতে ২০২৪ এর জুলাই গণঅভ্যুত্থানে জনগণের ঐক্য তৈরি হয়েছে। কোনো অবস্থাতেই আবার বিভাজনের রাজনীতি এখানে তৈরি হতে দেওয়া যাবে না। সেকারণেই আমরা প্রথম থেকেই বলে আসছি, গণঅভ্যুত্থানে যে নির্বিচার হত্যাকাণ্ড হয়েছে, অবিলম্বে তার বিচার শুরু হতে হবে। আমাদের পাশাপাশি অভ্যুত্থানের পক্ষের রাজনৈতিক দলগুলোও এটিকে জরুরি কাজ বলে মনে করছে। ১৯৭১ সালের সময়কার অপরাধগুলোর বিচার না করে সেটাকে বন্ধ করে রাখার কারনে দেশ একটা দীর্ঘস্থায়ী বিভাজনের দিকে চলে গিয়েছে। সেই জায়গা থেকে যদি বাংলাদেশকে সরে আসতে হয়, তার জন্য বিচার প্রক্রিয়া সঠিকভাবে সম্পন্ন করা জরুরি। বাংলাদেশে কেউ যাতে বিভাজনের ওপরে দাঁড়িয়ে রাজনীতি করতে না পারে, কেউ যেন গুণ্ডাতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে না পারে সেজন্য এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার জন্য আমাদের সংগ্রাম জারি রাখা দরকার।
এই মুহূর্তে যে ধরনের গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক উত্তরণের জন্য বাংলাদেশ অপেক্ষা করছে, সেটার জন্য বাংলাদেশের জনগণের মধ্যে জাতীয় ঐক্য প্রয়োজন। কেউ যাতে বিভাজন তৈরি করে বাংলাদেশের এই নতুন যাত্রায় বাধা দিতে না পারে, এজন্য সমস্ত পক্ষকেই একটা জায়গায় আসতে হবে যে, কেউ যেন ১৯৭১, ২০২৪ সহ বাংলাদেশের পরিবর্তনের ঐতিহাসিক জায়গাগুলোতে বাংলাদেশের জনগণের আকাঙ্ক্ষার বিপরীতে অবস্থান না নেয়। এগুলোকে ধারণ করেই রাজনীতি এগিয়ে নেওয়ার জন্য আমরা সকল পক্ষকে আহবান জানাই। এক্ষেত্রে যার যা ভূমিকা সে অনুযায়ী অবস্থান নিতে হবে। যাদের বিচার দরকার তাদেরকে বিচারের মুখোমুখি হতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে পার্থক্য হবে কে জনগণের জন্য কী করতে চায় সেটা নিয়ে। কিন্তু ইতিহাসের বিষয়গুলো সবাইকে একটা সাধারণ জায়গায় আসতে হবে। এই জায়গায় পৌঁছাতে না পারলে জাতি হিসেবে আমরা বেশি দূর এগোতে পারব না।
কোনো যদি/কিন্তু ছাড়াই স্পষ্টভাবে আমরা বলি যে, ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের ইতিহাস যে দিকে গিয়েছে, সেসময় জামায়াত তার বিপরীত দিকে গিয়েছে। জনগণ যে পক্ষে গিয়েছে, তারা তার বিপক্ষে গিয়েছে। এটা প্রমাণিত। এভাবে ইতিহাসে এই নির্ধারক সময়ে তারা জনগণের আকাঙ্ক্ষার বিপক্ষে ছিল। এখন সেই অবস্থানের জন্য যদি তারা জনগণের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করতে চান, তাহলে সেটা যদি/কিন্তু ছাড়াই করা দরকার। এখানে যদি/কিন্তু বা কোনো অস্পষ্টতা রাখলে সেটা জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্যতা তৈরি করবে বলে আমরা মনে করি না।
আরেকটি বিষয় হলো, এখানে যে বিভাজনের খেলাটা তৈরি করার চেষ্টা করা হচ্ছে, যেভাবে আক্রমণ করা হচ্ছে, নতুন করে ট্যাগ দেওয়া হচ্ছে- এগুলো আমাদেরকে আবারও শঙ্কার মধ্যে ফেলছে যে, আওয়ামী ফ্যাসিবাদের মতো আবার কোনো ফ্যাসিবাদী ধারা তৈরি হতে যাচ্ছে কিনা। একে প্রতিরোধ করার জন্য আমাদেরকে মনোযোগী হতে হবে।
শেষ কথা হলো, ১৯৭১ ও ২০২৪ কে পরস্পরের মুখোমুখি করে দাঁড় করানোর যে চেষ্টা বিভিন্ন পক্ষ থেকে করা হচ্ছে, একে আমরা পুরোপুরিভাবে প্রত্যাখ্যান করি। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে জনগণের যে আকাঙ্ক্ষা ছিল সে আকাঙ্ক্ষার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেই এখানে ফ্যাসিবাদ প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে, মানুষের অধিকারকে খর্ব করা হয়েছে। ২০২৪ এর গণঅভ্যুত্থান হলো ১৯৭১ সালেরই ধারাবাহিকতা। এই দুইয়ের মাঝে কোনো বিরোধ নাই। পুরানো ফ্যাসিবাদের যেমন আমরা বিরোধিতা করে, তেমনি নতুন করে কেউ যাতে ফ্যাসিবাদী হতে না পারে সে ব্যাপারে আমরা লড়াই জারি রাখি। কোনো বিভাজনের মধ্যে ফেলে বাংলাদেশের জনগণের এই অর্জনকে ছোট করা যাবে না, এই অর্জনকে মুছে ফেলা যাবে না। এই অর্জনকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়াই আমাদের অঙ্গীকার।
Leave a Reply