1. online@bhashatv.com : বার্তা বিভাগ : বার্তা বিভাগ
  2. admin@bhashatv.com : admin :
বুধবার, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩:৪৮ পূর্বাহ্ন

কারাগারের ভেতরে মানুষগুলো কি মানুষ নন? – এ্যাডভোকেট নুরুন্নাহার আক্তার

Reporter Name
  • শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ৩৮ পাঠ করা হয়েছে

১৩ মাস কনডেম সেলে একজন সাবেক বন্দীর দেখা খাবার ও চিকিৎসার নির্মম বাস্তবতা

“কারাগার একজন মানুষের স্বাধীনতা কেড়ে নিতে পারে; কিন্তু তার মানবিক মর্যাদা কেড়ে নেওয়ার অধিকার কারও নেই।”

কারাগার—শব্দটির মধ্যেই যেন এক ধরনের অন্ধকার লুকিয়ে আছে। বাইরে থেকে আমরা দেখি উঁচু দেয়াল, লোহার গেট, তালা আর পাহারা। কিন্তু এই দেয়ালের ভেতরে যারা থাকেন, তাদের প্রতিদিনের জীবন কেমন—তারা কী খান, কীভাবে অসুস্থ হন, অসুস্থ হলে কে তাদের চিকিৎসা দেন—সেই গল্প খুব কম মানুষই জানেন, আমি জানি।

কারণ আমি নিজেই ১৩ মাস কনডেম সেলে কাটিয়েছি।

আজ তাই কোনো বই পড়ে, কোনো প্রতিবেদন পড়ে কিংবা কারও মুখে শুনে নয়—নিজের চোখে দেখা এবং নিজের শরীরে অনুভব করা অভিজ্ঞতা থেকেই বলছি কারাগারের খাবার ও চিকিৎসাব্যবস্থার কথা।

খাবারের থালায় ক্ষুধা আছে, পুষ্টি নেই

কারাগারে স্বাধীনতা নেই—এটি স্বাভাবিক। কিন্তু একজন বন্দীর সামনে যখন খাবারের থালা আসে, তখন অন্তত সেখানে তার বেঁচে থাকার প্রয়োজনীয় পুষ্টি থাকবে—এটাই তো প্রত্যাশা।

আমার অভিজ্ঞতা ছিল ভিন্ন।

প্রতিদিন সকাল ৮টার দিকে দেওয়া হতো একটি রুটি। রুটিটি এতটাই শক্ত ও পোড়া থাকতো যে স্বাভাবিকভাবে সেটি খাওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়তো। সঙ্গে দেওয়া হতো সামান্য সবজি—যার মান নিয়ে প্রশ্ন না তুলে বরং প্রশ্ন জাগত, এটি আদৌ মানুষের খাবার কি না।

দুপুর ২টার দিকে আসতো ভাত।

কিন্তু সেই ভাতের সঙ্গে কখনো কখনো থাকতো অসংখ্য পোকা।

ক্ষুধার কাছে মানুষের রুচি পরাজিত হয়—এ কথা কারাগারে থাকলে খুব ভালোভাবে বোঝা যায়। বাইরে যে খাবার দেখে একজন মানুষ থালা সরিয়ে রাখতেন, কারাগারের ভেতরে ক্ষুধার কারণে তাকেই কখনো কখনো খেতে হয়।

কারণ সেখানে বিকল্প নেই।

ভাতের সঙ্গে কখনো সবজি, কখনো পাঙ্গাশ বা তেলাপিয়া মাছের একটি টুকরা দেওয়া হতো।

মাছ কাটার দক্ষতার কথা অবশ্য আলাদাভাবে বলতে হয়।

মাছ যিনি কাটতেন, তিনি নিঃসন্দেহে অসাধারণ প্রতিভাবান!

এত বড় মাছকে এত ছোট, এত চিকন করে কাটা—এটি নিঃসন্দেহে এক ধরনের শিল্প। মাছের টুকরো দেখে কখনো কখনো মনে হতো, মাছ খাওয়ানো নয়, মাছের অস্তিত্বের প্রমাণটুকু দেওয়া হয়েছে!

কথাটি শুনতে হাস্যরসের মনে হতে পারে। কিন্তু এর পেছনে যে বাস্তবতা, সেটি মোটেও হাসির নয়।

বিকেল ৩টায় রাতের খাবার!

কারাগারের খাদ্যব্যবস্থার আরেকটি অদ্ভুত বাস্তবতা হলো—বিকেল ৩টার দিকেই দিয়ে দেওয়া হতো রাতের ভাত।

তারপর সেই ভাত পড়ে থাকতো দীর্ঘ সময়।

রাত যত গভীর হতো, খাবারের অবস্থাও তত খারাপ হতে থাকতো।

একদিকে পোকাযুক্ত ভাত, অন্যদিকে দীর্ঘসময় পড়ে থাকা নষ্ট ও পচে যাওয়া খাবার—তারপরও সেটিই রাতের খাবার।

একজন ক্ষুধার্ত বন্দীর সামনে তখন দুটি পথ থাকে—খাবারটি খাওয়া, অথবা না খেয়ে থাকা।

এখানেই বন্দিত্বের সবচেয়ে নির্মম বাস্তবতা।

আপনার ক্ষুধা আছে, কিন্তু খাবার বেছে নেওয়ার অধিকার নেই।

আপনার অসুস্থতা আছে, কিন্তু নিজের ইচ্ছামতো চিকিৎসক বেছে নেওয়ার অধিকার নেই।

আপনার কষ্ট আছে, কিন্তু সেই কষ্ট থেকে বেরিয়ে আসার পথও আপনার নিজের হাতে নেই।

অপরাধের শাস্তি হোক, অপুষ্টির নয়

একজন মানুষ অপরাধ করেছেন কি না—তার সিদ্ধান্ত আদালত দেবেন।

দোষী হলে তিনি আইন অনুযায়ী শাস্তি ভোগ করবেন।

কিন্তু একজন মানুষকে কারাগারে পাঠানোর অর্থ কি তাকে অস্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়ানো?

অপুষ্টিতে রাখা?

চিকিৎসার অভাবে কষ্ট দেওয়া?

আমার মনে হয়, কোনো সভ্য রাষ্ট্রের উত্তর ‘হ্যাঁ’ হতে পারে না।

কারাগার শাস্তির জায়গা হতে পারে, কিন্তু মানবিকতার বাইরে কোনো জায়গা হতে পারে না।

একজন বন্দী তার স্বাধীনতা হারিয়েছেন। তিনি তার পরিবারের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন। তার স্বাভাবিক জীবন থেমে গেছে। তার চলাফেরার স্বাধীনতা নেই।

তাহলে রাষ্ট্রের দায়িত্ব তো বরং আরও বেড়ে যায়—তার অন্তত খাবার ও চিকিৎসার অধিকার নিশ্চিত করা।

চিকিৎসা: অসুস্থ হলে অপেক্ষা

কারাগারের চিকিৎসাব্যবস্থার অভিজ্ঞতাও খুব সুখকর নয়।

প্রাথমিক চিকিৎসার জন্য চিকিৎসক থাকলেও তিনি প্রতিদিন উপস্থিত থাকেন না; নির্দিষ্ট দিনে চিকিৎসা দেওয়ার ব্যবস্থা থাকে। কিন্তু অসুস্থতা তো ক্যালেন্ডার দেখে আসে না।

জ্বর আজও আসতে পারে।

বুকে ব্যথা রাতেও হতে পারে।

শ্বাসকষ্ট ভোরেও শুরু হতে পারে।

হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়া একজন বন্দীর তখন কী হবে?

গুরুতর অসুস্থ বন্দীকে নানা প্রশাসনিক প্রটোকল মেনে সরকারি হাসপাতালে নেওয়া হলেও হাসপাতালে গিয়ে সবসময় প্রয়োজনীয় চিকিৎসা পাওয়া যায়—এমন নিশ্চয়তা নেই।

প্রয়োজনীয় ওষুধের সংকটও অনেক সময় দেখা যায়।

বাইরে একজন মানুষ অসুস্থ হলে নিজের সিদ্ধান্তে চিকিৎসকের কাছে যেতে পারেন। হাসপাতালে ভর্তি হতে পারেন। প্রয়োজনীয় ওষুধ কিনতে পারেন।

কিন্তু একজন বন্দীর ক্ষেত্রে প্রতিটি পদক্ষেপই নির্ভর করে ব্যবস্থার ওপর।

তাই বন্দীর চিকিৎসার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের দায়িত্ব সাধারণ নাগরিকের চেয়েও বেশি।

সবচেয়ে বড় নীরবতা—মানসিক স্বাস্থ্য

শারীরিক অসুস্থতার কথা আমরা কিছুটা বলি। কিন্তু বন্দীদের মানসিক স্বাস্থ্যের কথা খুব কমই বলি।

অথচ দীর্ঘদিন কারাগারে থাকা একজন মানুষের সবচেয়ে বড় যুদ্ধ অনেক সময় নিজের মনের সঙ্গে।

একই দেয়াল।

একই দরজা।

একই তালা।

একই রুটিন।

আর দিনের পর দিন অপেক্ষা।

কবে মুক্তি?

কী হবে ভবিষ্যৎ?

পরিবার কেমন আছে?

বাইরের পৃথিবী কি আমাকে ভুলে গেছে?

এই প্রশ্নগুলো একজন বন্দীর মনের ভেতরে প্রতিদিন ঘুরতে থাকে।

দীর্ঘ বন্দিত্ব মানুষকে ভেতর থেকে ভেঙে দিতে পারে। হতাশা, বিষণ্ণতা, উদ্বেগ, ভয়, একাকিত্ব, রাগ—নানা ধরনের মানসিক সমস্যা তৈরি হতে পারে।

তাই দীর্ঘদিন কারাগারে থাকা বন্দীদের জন্য নিয়মিত মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ও মানসিক স্বাস্থ্যসেবা থাকা বিলাসিতা নয়, প্রয়োজন।

শুধু শরীরের চিকিৎসা করলেই একজন মানুষ সুস্থ থাকেন না।

মনেরও চিকিৎসা প্রয়োজন।

কারাগারে থাকা শিশুটির অপরাধ কী?

কারাগারে অনেক সময় মায়ের সঙ্গে ছোট শিশুও থাকে।

সেই শিশুটি কোনো অপরাধ করেনি।

তার পৃথিবী হওয়ার কথা ছিল মায়ের কোলে নিরাপত্তা, খেলাধুলা, পুষ্টিকর খাবার, শিক্ষা এবং স্বাভাবিক শৈশব।

কিন্তু সে বড় হয় কারাগারের পরিবেশে।

তাই শিশুদের খাদ্য, পুষ্টি, চিকিৎসা ও মানসিক বিকাশের বিষয়টি সাধারণ বন্দীদের বিষয় হিসেবে দেখলে চলবে না।

তাদের জন্য আলাদা ও বয়সোপযোগী খাদ্য এবং চিকিৎসার ব্যবস্থা থাকা জরুরি।

সরকারের কাছে আমার কিছু প্রশ্ন

আমি বন্দীদের জন্য কোনো বিলাসিতা দাবি করছি না।

আমি বিশেষ কোনো সুবিধাও চাইছি না।

আমি শুধু জানতে চাই—

রাষ্ট্রের হেফাজতে থাকা একজন মানুষের জীবন ও স্বাস্থ্যের দায়িত্ব কার?

যদি রাষ্ট্র তার স্বাধীনতা নিয়ন্ত্রণ করে, তবে তার জীবন রক্ষার দায়িত্বও কি রাষ্ট্রের নয়?

যদি একজন বন্দী নিজের ইচ্ছায় খাবার কিনতে না পারেন, তাহলে রাষ্ট্র কি তাকে নিরাপদ ও পুষ্টিকর খাবার দেওয়ার দায়িত্ব থেকে মুক্ত?

যদি একজন বন্দী নিজের ইচ্ছায় চিকিৎসকের কাছে যেতে না পারেন, তাহলে সময়মতো চিকিৎসা নিশ্চিত করার দায়িত্ব কার?

এই প্রশ্নগুলোর উত্তর শুধু মানবিকতার প্রশ্ন নয়—এগুলো রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব ও জবাবদিহিতার প্রশ্ন।

এখনই পরিবর্তন প্রয়োজন

কারাগারের খাদ্যব্যবস্থা নিয়মিত ও স্বাধীনভাবে পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন।

খাবারের মান, পুষ্টিগুণ, নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্যসম্মত প্রস্তুতি নিশ্চিত করতে হবে। বন্দীদের খাবারে পোকামাকড় বা দূষণ যেন না থাকে, সে বিষয়ে কার্যকর নজরদারি থাকতে হবে।

শিশুদের জন্য বয়স ও শারীরিক প্রয়োজন অনুযায়ী পৃথক পুষ্টিকর খাবার নিশ্চিত করতে হবে।

কারাগারে সার্বক্ষণিক প্রাথমিক চিকিৎসা, জরুরি চিকিৎসা সুবিধা, পর্যাপ্ত ওষুধ এবং দ্রুত হাসপাতালে নেওয়ার কার্যকর ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—দীর্ঘমেয়াদি বন্দীদের জন্য নিয়মিত মানসিক স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও চিকিৎসা নিশ্চিত করতে হবে।

কারণ একজন মানুষকে শুধু লোহার শিকলের মধ্যে আটকে রাখলেই তার সব কষ্ট শেষ হয়ে যায় না। বরং কখনো কখনো তখনই শুরু হয় তার সবচেয়ে গভীর মানসিক যুদ্ধ।

শেষ কথাঃ

১৩ মাস কনডেম সেলে থাকার অভিজ্ঞতা আমাকে একটি বিষয় খুব গভীরভাবে শিখিয়েছে—

স্বাধীনতার মূল্য বোঝার জন্য কখনো কখনো স্বাধীনতা হারাতে হয়।

আর কারাগারের ভেতরে থেকে আমি আরও একটি বিষয় বুঝেছি—

মানুষের সবচেয়ে বড় পরিচয় তার অপরাধ নয়; তার মানবিক অস্তিত্ব।

কেউ আসামি হতে পারেন, কেউ কয়েদি হতে পারেন। আদালত তার অপরাধের বিচার করবেন। কিন্তু রাষ্ট্রের হেফাজতে থাকা অবস্থায় তিনি একজন মানুষ হিসেবেই থাকেন।

তার ক্ষুধা আছে।

তার শরীর আছে।

তার ব্যথা আছে।

তার মন আছে।

তার বেঁচে থাকার অধিকার আছে।

তাই আমি বিশ্বাস করি—

কারাগারের দরজা একজন মানুষের স্বাধীনতা বন্ধ করতে পারে, কিন্তু তার মানবিক অধিকার বন্ধ করতে পারে না।

একটি রাষ্ট্র কতটা সভ্য, তা শুধু তার উঁচু ভবন, উন্নত সড়ক কিংবা বড় বড় উন্নয়ন প্রকল্প দিয়ে বিচার করা যায় না।

কখনো কখনো একটি রাষ্ট্রের মানবিকতার সবচেয়ে নির্মম পরীক্ষা হয় তার কারাগারের অন্ধকার কক্ষে।

সেখানে একজন বন্দী কী খাচ্ছেন—

অসুস্থ হলে কে তার পাশে দাঁড়াচ্ছে—

তার সন্তান কী খাচ্ছে?

আর দীর্ঘ বন্দিত্বে তার মন বেঁচে আছে কি না—

সেই প্রশ্নগুলোর উত্তরেই লুকিয়ে থাকে একটি রাষ্ট্রের মানবিক মুখ।

আমি সেই মুখটিই দেখতে চাই।

কারাগারের দেয়ালের ওপারেও যেন মানুষকে মানুষ হিসেবেই দেখা হয়।

এ্যাডভোকেট নুরুন্নাহার আক্তার
আইনজীবী
বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট।

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই ক্যাটাগরীর আরো খবর
  • All rights reserved © bhashatv.com
Design By Raytahost