ঋতম্ভরা ব্যানার্জী, ভারতের প্রতিনিধি: আমরা শুধু বাংলাদেশ ও ভারতের বাঙালি ও বাংলা ভাষা নিয়েই চর্চা করি। কিন্তু এই দুটি দেশ ছাড়াও বিশ্বের ১৪ টি দেশে বাংলা ভাষা রাষ্ট্রের প্রথম, দ্বিতীয় নয়তো তৃতীয় স্থানে রয়েছে। আমেরিকা, ব্রিটেন,অস্ট্রেলিয়া, সুইডেন সহ আফ্রিকার উগান্ডা, দক্ষিন আফ্রিকা ও অন্যান্য অনেক দেশের অন্যতম ভাষা বাংলা।
উগান্ডার চরম আইনশৃঙ্খলার দুরবস্থার সময় রাষ্ট্রসঙ্ঘের নির্দেশে সেখানে নিরাপত্তা বাহিনীকে পাঠানো হয়েছিল। এই বাহিনী ছিল বাংলাদেশের।
বাংলাদেশের সেনা বাহিনী বেশ কিছুকাল সেখানে থাকায়,এবং নাগরিকদের নিরাপত্তা রক্ষার কাজে ব্যস্ত থাকায় বাংলা ভাষা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে সেই দেশে। উল্লেখযোগ্য, সেখানকার অন্যতম রাষ্ট্র ভাষা বাংলা। আফ্রিকার আরো দুটি দেশে দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে বাংলা।
আমেরিকায় বাংলা এতোই প্রচলিত যে নিউ ইয়র্কের মেয়র নির্বাচনে ভোটের ব্যালট পেপার ছাপা হয় বাংলাকে অন্যতম ভাষা হিসাবে রেখে।
সুইডেন, ব্রিটেনের অবস্থাও তাই।
হিন্দু,মুসলমান,খ্রিস্টান, বৌদ্ধ ধার্মিক পরিচয় সেখানে গৌণ। বাঙালি গর্বিত বাংলা ভাষার জন্য।
বাংলা ভাষার দাবিতে বর্বর পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে গর্জে ওঠেছিল পূর্বপাকিস্তানের বাঙালিরা ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে। সেটাই ছিল বাংলাদেশ বপনের বীজ। তারই ধারাবাহিকতায় ১৯৭১ সাল। স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র বাংলাদেশ।
বাংলাদেশের রাষ্ট্রভাষা বাংলা। ভারতের কয়েকটি রাজ্যের সরকারি ভাষা বাংলা। বাস্তবে ভারতের দ্বিতীয় সর্বাধিক ব্যবহৃত ভাষা হচ্ছে বাংলা। বর্তমানে ২৬ কোটিরও বেশি মানুষের মাতৃভাষা বাংলা। বিশ্বে সর্বাধিক ব্যবহৃত ভাষার মধ্যে বাংলার অবস্থান পঞ্চম।
২০০২ সালে সিয়েরালিওন প্রজাতন্ত্র বাংলাকে সেদেশের অন্যতম সরকারি ভাষা হিসেবে ঘোষণা করেছে। ১৯৯১ থেকে ২০০২ সাল পর্যন্ত সিয়েরালিওন গৃহযুদ্ধে জর্জরিত ছিল। যুদ্ধকালীন শান্তি বজায় রাখার জন্য জাতিসংঘ সেখানে তাদের শান্তিরক্ষী বাহিনীর একটি বড় দল পাঠায়। সিয়েরালিওনের বিদ্রোহীকবলিত অঞ্চলসমূহের নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করার জন্য তখন বাংলাদেশি শান্তিরক্ষী বাহিনীর সদস্যরা অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। ২০০২ সালে দেশটির তৎকালীন প্রেসিডেন্ট আহমাদ তেজান কাব্বা ঘোষণা করেন যে, বাংলা হবে সেদেশের অন্যতম সরকারি ভাষা।
আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে লিঙ্গুয়াপাক্স ইনস্টিটিউট প্রতিবছর পুরস্কার প্রদান করে। স্পেনের বার্সেলোনায় অবস্থিত লিঙ্গুয়াপাক্স ইনস্টিটিউট বিশ্বব্যাপী ভাষাগত বৈচিত্র্য সংরক্ষণ ও উন্নয়নের লক্ষ্যে এই কাজটি করে চলেছে। যারা ভাষাগত বৈচিত্র্য বা বহুভাষিক শিক্ষার ক্ষেত্রে অসামান্য অবদান রাখছেন, এই পুরস্কারটি তাদের দেওয়া হয়।
কানাডার প্রথম অডিওভিজ্যুয়াল মাতৃভাষা পাবলিক স্মৃতিস্মারক ‘দি লিঙ্গুয়া একুয়া’ ২০০৯ সালে উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসকে শ্রদ্ধা জানানোর জন্য কানাডার ব্রিটিশ কলম্বিয়া প্রদেশের ‘সারি’ শহর কর্তৃপক্ষ ‘দি লিঙ্গুয়া একুয়া’ শীর্ষক স্মৃতিস্মারকটি তৈরির জন্য অর্থায়ন করে। ‘লিঙ্গুয়া একুয়া’ এমন একটি জায়গা যেখানে সকল ভাষাভাষী এসে ভাব বিনিময়ের মাধ্যমে অন্য ভাষার সৌন্দর্যের প্রতি তাদের মুগ্ধতা প্রকাশ করে।
২০০৬ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি অস্ট্রেলিয়ার সিডনি শহরের অ্যাশফিল্ড পার্কে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের স্মরণে একটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মিত হয়েছে। স্মৃতিস্তম্ভটি একটি সুউচ্চ পাথরখণ্ডের বেদির ওপর নির্মিত। এর মধ্যে বাংলাদেশের শহীদ মিনারের চিত্র খোদাই করে তার নিচে বাংলা ও ইংরেজিতে ‘ভাষা শহীদদের আমরা কখনও ভুলব না’ কথাটি উৎকীর্ণ রয়েছে। পাশাপাশি মাতৃভাষায় প্রতীক হিসেবে সাতটি ভাষার বর্ণমালা ব্যবহার করা হয়েছে।
Leave a Reply