ক্রাইম ডেস্কঃ গৃহকর্মী নির্যাতন নাটক সাজিয়ে ৩৭ হাজার কোটি টাকার বোয়িং বিমান ক্রয়ের ডিল করার জন্য পথের কাঁটা সরাতেই এমডি গ্রেপ্তার।
রাষ্ট্রীয় পতাকাবাহী সংস্থা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় কেনাকাটা যখন চূড়ান্ত পর্যায়ে, ঠিক তখনই সংস্থাটির শীর্ষ নির্বাহীর পতন ঘটল। মার্কিন উড়োজাহাজ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান বোয়িংয়ের সঙ্গে প্রায় ৩৭ হাজার কোটি টাকার চুক্তির আগমুহূর্তে ‘গৃহকর্মী নির্যাতন’এর অভিযোগ এনে গ্রেপ্তার হয়েছেন বিমানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও সিইও সাফিকুর রহমান।
দৃশ্যত এটি একটি সাধারণ ফৌজদারি মামলা মনে হলেও, এভিয়েশন খাতের অন্দরমহলে খোঁজ নিলেই শোনা যাচ্ছে নানা গুঞ্জন। অভিযোগ উঠেছে, ৩৭ হাজার কোটি টাকার বিশাল বাণিজ্যের পথ নিরাপদ করতেই অত্যন্ত সুকৌশলে সুপরিকল্পিতভাবে এই গ্রেপ্তারের ‘নাটক’ সাজানো হয়েছে।
ডলার সংকটে ধুঁকতে থাকা বাংলাদেশের অর্থনীতির ওপর বিশাল ঋণের বোঝা চাপানোর এই প্রক্রিয়ায় এমডি বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন কি না এমন সমালোচনাই শোনাযাচ্ছে।
সন্দেহজনক অবস্থাটি তখনই তৈরী হয়, বোয়িংয়ের সঙ্গে দরকষাকষির চূড়ান্ত টেবিলে এমডি যখন অনড় ছিলেন এবং ঋণের ফাঁদে ডলার সংকটের মধ্যে ৩৭ হাজার কোটি টাকার ‘বিলাসিতা’ নিয়ে এমডির আপত্তি করেছিলেন, ঠিক তখনই এই গ্রেপ্তার নাটকটি মঞ্চায়ন করা হয়।
কিছু স্বার্থান্বেষী মহলের বাণিজ্যের স্বার্থে ‘পথের কাঁটা’ সরাতে পুরোনো কায়দায় চরিত্র হনন ও মামলার এই নীল নকশা কার্যকর করা হয়।
বোয়িংয়ের প্রস্তাবিত ১৪টি বিমানের (ড্রিমলাইনার ৭৮৭-১০ ও ৭৩৭ ম্যাক্স) মূল্য প্রায় ৩.২ বিলিয়ন ডলার বা ৩৭ হাজার কোটি টাকা। জানা গেছে, বিমানের টেকনিক্যাল কমিটি এবং এমডি সাফিকুর রহমান এই বিশাল অংকের কেনাকাটায় আরও ১০ শতাংশ ছাড় এবং দীর্ঘমেয়াদি সুবিধা আদায়ের পক্ষে শক্ত অবস্থান নিয়েছিলেন। বিমানের একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানায়, ‘একটি প্রভাবশালী মহল দ্রুততম সময়ে কোনো যাচাই-বাছাই ছাড়াই বোয়িংয়ের সঙ্গে চুক্তি সই করতে মরিয়া হয়ে উঠে। এমডি চেয়েছিলেন এয়ারবাস ও বোয়িংয়ের মধ্যে প্রতিযোগিতা সৃষ্টি করে দাম কমাতে। এই বিলম্ব সইতে না পেরেই তাকে সরানোর জন্য এই মোক্ষম সময় বেছে নেওয়া হয়েছে বলে জানান।
গৃহকর্মী নির্যাতন: সত্য নাকি সাজানো ফাঁদ?
উত্তরায় এমডির বাসভবন থেকে ১১ বছর বয়সী গৃহকর্মীকে উদ্ধারের ঘটনাটি পুলিশ ফলাও করে প্রচার করেছে। কিন্তু বিশ্লেষকদের প্রশ্ন, নির্যাতন যদি দীর্ঘদিনের হয়, তবে এতদিন কেন কোনো অভিযোগ ওঠেনি? এবং কেন ঠিক চুক্তির স্পর্শকাতর সময়েই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এতটা সক্রিয় হলো?
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ও এভিয়েশন সংশ্লিষ্টদের মধ্যে গুঞ্জন, এমডিকে মানসিকভাবে ভেঙে ফেলতে এবং সামাজিকভাবে হেয় করতেই এই ‘স্পর্শকাতর’ অভিযোগটি সামনে আনা হয়েছে। অতীতেও বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে সৎ বা ভিন্নমতের কর্মকর্তাদের সরাতে নারীঘটিত বা নৈতিক স্খলনের অভিযোগ আনার ‘নীল নকশা’ দেখা গেছে। সাফিকুর রহমানের ক্ষেত্রেও তেমন কোনো সাজানো চিত্রনাট্য মঞ্চস্থ হলো কি না, ধোঁয়াশা কাটছে না তা নিয়ে।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য ঘাটতি কমানোর দোহাই দিয়ে এই বিমানগুলো কেনা হচ্ছে বলে প্রচার করা হচ্ছে। কিন্তু অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এটি একটি আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত। দেশের রিজার্ভ যখন তলানিতে, তখন নিছক রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সন্তুষ্টির জন্য হাজার কোটি টাকার ঋণের বোঝা জনগণের ঘাড়ে চাপানো হচ্ছে।
অভিযোগ রয়েছে, এই কেনাকাটার পেছনে বিশাল অংকের ‘কমিশন বাণিজ্য’ জড়িত। এমডি সাফিকুর রহমান হয়তো এই অনৈতিক প্রক্রিয়ার অংশ হতে চাননি, অথবা তার পেশাদার অবস্থান কমিশনের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। ফলে তাকে সরিয়ে দেওয়ার মাধ্যমে বাণিজ্যের পথ পরিষ্কার করা হলো।
এমডি সাফিকুর রহমানের গ্রেপ্তারের মধ্য দিয়ে বিমানে একটি ভয়ের সংস্কৃতি তৈরি করা হয়েছে। পরিষ্কার ভাবেই বার্তাটি প্রচার করা হলো; ৩৭ হাজার কোটি টাকার এই প্রজেক্টের পথে কেউ বাধা হয়ে দাঁড়ালে তার পরিণতি ভালো হবে না।
এখন প্রশ্ন থেকে যায়, এমডিকে সরানোর পর কি তড়িঘড়ি করে বোয়িংয়ের সঙ্গে চুক্তি সই হবে? গৃহকর্মী নির্যাতনের অভিযোগের আড়ালে কি ঢাকা পড়ে যাবে হাজার কোটি টাকা লুটপাটের ষড়যন্ত্র? স্বচ্ছ তদন্ত না হলে এই ঘটনা বিমানের ইতিহাসে একটি কালো অধ্যায় হয়েই থাকবে।
Leave a Reply