পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী চলে যাবার পর তিনি পুড়ে যাওয়া ছাই হাতে নিয়ে বলতে থাকেন তোদের আর বেশীদিন নেই এ’দেশ ছেড়ে চলে যেতেই হবে। শতবর্ষী এই বৃদ্ধের কথায় সমগ্র বাংলার আকাশ বাতাস প্রকম্পিত হতে থাকে সেদিন। শোলাবাড়ীয়ায় গোলাবারুদের শব্দের সাথে তাঁর আওয়াজ মিলে যেতে থাকে।
চরপাড়া গ্রামে আগুন দেখে গ্যারকার বিলে ওপার থেকে সুজানগর ও পাবনা সদর থানার মুক্তিযোদ্ধাগন একত্রিত হয়ে গ্যারকার বিলে এসে অবস্থান নেয়। তাদের বুঝতে বাঁকি থাকল না যে এ আর কারো বাড়ী নয় ওটা সিহাব উদ্দিনের বাড়ী হানাদারবাহিনী কর্তৃক আক্রমন হয়েছে। পাল্টা আক্রমনের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন গ্যারকার বিলে অবস্থানরত বীর মুক্তিযোদ্ধারা। গ্রামের আবাল বৃদ্ধ বনিতা, শিশু কিশোর, নারীদের কথা চিন্তা করেন, গ্রামটি ধ্বংস হয়ে যাবে ভেবে, তারা পাল্টা আক্রমন থেকে বিরত থাকেন।
এ দিকে নন্দনপুর বিজিত মুক্তিযোদ্ধারা পরবতী করনীয় নিয়ে ভাবছে, তারা সাঁথিয়া থানাকে মুক্ত রাখবে বলে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়। সিহাব উদ্দিন বলেন, চরপাড়া গ্রামে আমার বাড়ী আক্রান্ত এবং বাড়ীটি পুড়িয়ে দিয়েছে। লছের মাঝী খবর এনেছে আর দেরি নয় এখনি শোলাবাড়ীয়া ব্রিজে প্রতিরোধ করতে হবে। সঙ্গে সঙ্গে মুক্তিযোদ্ধা আফতাব উদ্দিন মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল লতিফ অন্য কোন চিন্তা না করে, অতিদ্রুত সবাইকে সঙ্গে নিয়ে শোলাবাড়ীয়া ব্রিজে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীদের বিরুদ্ধে আক্রমনের জন্য অগ্রসর হন। শোলাবাড়ীয়া ব্রিজের উপর একটি জিপগাড়িতে বসে ছিল কয়েকজন রাজাকার ও পাকিস্তানী বাহিনী। তখন সিহাব উদ্দিন ও সামসুর রহমান মুক্তিযোদ্ধা আফতাব উদ্দিন ও মুক্তিযোদ্ধ আব্দুল লতিফ তার দলবল নিয়ে উপস্থিত হন উত্তর শোলাবাড়ীয়া গ্রামে। তখন রাত প্রায় সাড়ে চারটার মতো। সিদ্ধান্ত নেয় তিনি শোলাবাড়ীয়া ব্রিজ উড়িয়ে দিবে। সেই মোতাবেক মুক্তিযোদ্ধগন ফসলের জমির মধ্যে দিয়ে ব্রিজের নিচে এসে ডিনামাইট চার্চ করে ব্রিজটি উরিয়ে দেয়। ব্রিজের নিকট থাকা রাজাকার ইসহাক মৌলানা, আব্দুস সোবাহান, মসলেম মোল্লাসহ পাকিস্তাানি হানাদার বাহিনী গাড়ী ফেলে রেখে পালিয়ে যায়। এই সংবাদ পেয়ে চরপাড়ায় অবস্থানরত রাজাকার ও পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী শোলাবাড়ীয়া মহাসড়কের দিকে অগ্রর হতে থাকে। সুযোগ বুঝে মুক্তিযোদ্ধ সিহাব উদ্দিন প্রথমেই গ্রেনেট চার্জ করেন। সাথে থাকেন ভাতিজা সামসুর রহমান। সেই সাথে আবতাব ও লতিফ একইসাথে অতর্কিত আক্রমন চালায়, অবস্থা বেগাতিক দেখে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী শোলাবাড়ীয়া মাঠে অবস্থান নেয়। সেখান থেকে তারা মুক্তিযোদ্ধাদের পাল্টা আক্রমন চালায় হনাদার বাহিনী। তুমল যুদ্ধ শুরু হয়। গ্রামের মানুষ পালাতে থাকেন। গ্রাম শুন্য হয়ে যায়।
অপর প্রান্ত থেকে গ্যারকার বিলে অবস্থানরত মুক্তিযোদ্ধারা আফসার উদিন ও আনিসুর রহমান রবুসহ মুক্তিযোদ্ধাগন যুদ্ধের অবস্থান নির্ণয় করে তারা চরপাড়া ও মাধপুরের মাঝ দিয়ে শোলাবাড়ীয়ার দিকে অগ্রসর হয়ে আক্রমন চালায়। তারা সিহাব উদ্দিন, আবতাব ও লতিফ বাহিনী উপর আক্রমন চালানো দেখে তারা আরও সাহসী হয়ে উঠে। মুক্তিযোদ্ধাদের এই অতর্কিত আক্রমনে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী দিশেহার হয়ে পরে। মুক্তিযোদ্ধাদের সর্বশক্তি নিয়োগ করেন। তখন এই শোলাবাড়ীয়া ব্রিজের উপর তুমল যুদ্ধ শুরু হয় মুক্তিযোদ্ধা আবতাব বাহিনীর সাথে। এই যুদ্ধে পাকিস্তানি হনাদার বাহিনী পরাজিত হয়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়। এই শোলাবাড়ীয়া ব্রিজের উপর সম্মূখ যুদ্ধে শহীদ হন সিহাব উদ্দিন ও সামসুর রহমান। এলাকার অনেক সাধারণ মানুষ আহত হন। নিহত হন সাধারণ নাগরিক আব্দুর রহমান। কয়েকজন পাকিস্তানি সৈন্যও নিহত হয়।
শহীদ সিহাব উদ্দিন, শহীদ সামসুর রহমানের মৃত দেহ পরবর্তীতে খুজে পাওয়া যায়নি। তাদের শহিদ দেহ কোথায় গেল আজও অজানা রয়ে গেছে। তার সন্তানগন আজও খুঁজেবেড়ায় এবং তার স্ত্রীর প্রশ্ন আমার স্বামীর শহীদদেহ কোথায়? এ প্রশ্নের উত্তর আজও কেউ দিতে পারেনি। এলাকায় কথিত আছে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী তাদের শহীদদেহ নিয়ে গিয়ে নগরবাড়ী ঘাটে ভাসিয়ে দিয়েছে। তবে ঐ দিন কয়েক জনের শহীদ দেহ নৌকায় করে পকিস্তানী হানাদার বাহিনী মাঝ যমুনায় ভাসিয়ে দিয়েছিল। তারা হতে পারে এই শোলাবাড়ীর সম্মুখ যুদ্ধে শহিদ হওয়া শহীদদের শহীদ দেহ । এটুকুই তাদের সান্তনা বৃদ্ধ পিতা স্ত্রী সন্তানদের। সেই দিন দুইজন মুক্তিযোদ্ধা শহিদ হলেন।
শহীদ শিহাব উদ্দিনের বৃদ্ধ পিতা এছের শেখ রাজাকারদের নিকট চিৎকার করে বলেছিলেন তোরা কোন বাবার সন্তান, বাবার সামনে এভাবে অত্যাচার করছ কে, কার কথা শোনে? অসহায় দৃষ্টিতে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখা ছারা আর কিছুই করার ছিলনা পিতার। সেই যে চোখোর অশ্রু শুকিয়ে অন্ধকার হয়েছে, অন্ধ অব্স্থায় ৯ বছর পর ১৯৮০ সালে ৩০ মে এ পৃথিবী ছেরে চলে জান শহীদ বীর মুক্তিযোদ্ধা সিহাব উদ্দিন শেখ এর পিতা। পুত্র হত্যার বিচার দেখে যেতে পারেননি তিনি।
শহীদ সিহাব উদ্দিনের পরিবারে বৃদ্ধ পিতা এছের শেখ, বড় ভাই চেয়াম্যন মোহম্মাদ আলী শেখ, মেঝ ভাই মোক্তার আলী শেখ, শহীদ শিহাব উদ্দিনের চার ছেলে ও এক মেয়ে, ছেলে হাসিনুর রহমান হাসু ৭১ সালে ষষ্ঠ শ্রেনীর ছাত্র, মেঝো ছেলে বাহানুর রহমান বাহার তৃতীয় শ্রেনীর ছাত্র, আব্দুল হালিম প্রথম শ্রেনীতে পড়া শুনা করে, মেয়ে শিউলি সবে হাঁটাহাটি শিখেছে, ২ মাস ১০ দিনের ছোট ছেলে নজরুল রেখে শহিদ হন।
বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ সিহাব উদ্দিন শেখ এর সেই আড়াই মাস বয়সী পুত্র সন্তান শেখ নজরুল ইসলাম। দুসস পরিবার এমন একজন বীর পুত্রকে পরিচালক প্রশাসন হিসেবে পেয়ে ধন্য।
একাত্তরের বীর সেনানী বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ সিহাব উদ্দিন শেখ এর প্রতি দুরন্ত সত্যের সন্ধানে (দুসস) পরিবারের পক্ষ থেকে বিনম্র শ্রদ্ধা।
মোহাম্মদ আহসান হাবীব, ব্যাবস্থাপনা পরিচালক, সম্পাদক ও প্রকাশক, দুরন্ত সত্যের সন্ধানে (দুসস)
Leave a Reply